আমাদের গ্রাম মধুপুর। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, পুকুর আর সাদা পাকা রাস্তা। ছোটবেলা থেকেই এখানকার মানুষদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে সবাই একে অপরকে বড় ভাই, ছোট বোন বা চাচাতো ভাই-বোন হিসেবে চেনে। আমার পরিবারেও সেই রীতিনীতি গেঁথে আছে, যেখানে আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হওয়াকে স্বাভাবিকই মনে করা হয়।
আমি রাফি, গ্রামের একমাত্র ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি—অবশ্য গ্রামে থাকার কারণে আমার জীবন ছিল শান্ত, মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির কোলে ঘেরা। আমার চাচাতো বোন সুমি ছিল আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ছোটবেলা থেকে আমরা ছিলাম inseparable বন্ধু, শৈশবের স্মৃতিতে পরিপূর্ণ। সে ছিল এক বছর বড়, সুন্দর হাসি আর সরল স্বভাব। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ছিল একরাশ মধুরতা, যেন দুই হৃদয় এক অন্যকে ছুঁয়ে যেতে চায় কিন্তু কখনো সরাসরি স্পর্শ হয়নি।
সুমির বাবা ও আমার বাবা চাচা-ভাতিজা সম্পর্ক, আর সেই সম্পর্ক আমাদের ছোটবেলায় অনেক গল্পের শুরু করেছিল। গ্রামে সবাই বলত, “চাচাতো ভাই-বোন একসঙ্গে বড় হলে বিয়ে করলে ভালো হয়, কারণ বোঝাপড়াটা সহজ হয়।”
আমি শুনে হাসতাম, “আরে, সুমি তো আমার বোনের মতো।”
কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলায়।
একদিন আমার বাবা বড় উৎসাহে ডেকেছিল, “রাফি, তোর বয়স হয়েছে, এখন বয়স হয়েছে বিবাহের চিন্তা করার। সুমির সঙ্গেই কথা হয়েছে।”
আমি থমকে গিয়েছিলাম। সুমি? আমার ছোটবেলার বন্ধু? বিয়ে?
সে সন্ধ্যায় বেলা বাড়তেই আমি সুমির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা খোলার আগে মন ভেঙে গিয়েছিল। সে দরজা খুলল, তার চোখে লুকানো ভাব চোখে পড়ল।
“তুই কি ভাবছিস?” সে জিজ্ঞাসা করল।
আমি মূর্খের মতো বললাম, “ভেবেছি যে… আমাদের সম্পর্কটা কি হবে?”
সুমি হাসল, “ভাইয়া, সম্পর্ক তো আমরা আমাদের মতো গড়ে তুলব। আমরা একে অপরকে সবসময় ভালো বুঝেছি, এটাই বড় কথা।”
আমাদের পরিবারের সবাই এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিল। মেঝে ছিল নানা পরিকল্পনা, বিবাহের পিঁড়িতে বসার জন্য। গ্রামে অনেকেই খুশি, কেউ কেউ বলল, “এই জুটি একদম সঠিক।”
বিয়ের দিন ছিল গ্রামের উৎসবের মতো। মাটির মন্ডপে সাজানো ফুল, গান, আর কণ্ঠের মিলনে মিশেছিল এক রকম আনন্দ। আমি যখন সুমির হাতে হাত দিলাম, মনে হলো যেন পুরো জীবন এক মুহূর্তে থেমে গেছে। চারপাশে যেমন আনন্দ, তেমনি মনটা ছিল একটু নীরব, কিছু ভাবনা আমার ঘিরে ধরেছিল।
বিয়ের পরের দিন সকালেই আমরা দুজন একসঙ্গে নতুন জীবনের শুরু করলাম। আমি তার পাশে ছিলাম, সে আমার হাতে ছিল, কিন্তু অন্তর ছিল একরাশ দায়িত্ব আর অজানা চিন্তার।
সুমি ছিল আমার বন্ধু, আমার আত্মীয়, আমার জীবনের সেই মানুষ যার জন্য আমি সবসময় প্রস্তুত ছিলাম। আমরা দুজনেই জানতাম, আমাদের সামনে যাত্রা কঠিন হবে, কিন্তু একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল অবিচল।
আমাদের দিনগুলি কেটে যেতে লাগল গ্রামের ছোট ছোট কাজের মাঝে, একসাথে ফসল তোলা, পুকুর থেকে জল তোলা, বাজার যাওয়া। প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের মন ভরে উঠত একে অপরের জন্য ভালোবাসায়।
একদিন সন্ধ্যায় আমরা নদীর তীরে বসে গল্প করছিলাম। সুমি হঠাৎ বলল, “রাফি, তুমি কি ভাবো, আমাদের সম্পর্ক শুধু সম্পর্ক নয়, এটা এক নতুন শুরু?”
আমি তাকিয়ে বললাম, “সুমি, আমি জানি আমাদের জীবনের পথ সহজ হবে না, কিন্তু আমি চাই তোমাকে সারাজীবন পাশে পেতে।”
তার চোখে তখন জ্বলে উঠল এক অজানা দীপ, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভাইয়া, আর আমি চাই আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হোক।”
তার সেই কথাগুলো আমার হৃদয়ে এক সুর তোলে। আমি বুঝতে পারলাম, চাচাতো বোনের সঙ্গেও ভালোবাসা আর বন্ধুত্ব মিলিয়ে জীবনের সব রঙ ফুটে উঠতে পারে।
সময় চলে গেল। আমরা দুইজন একে অপরের শক্তি হয়ে উঠলাম। আমি যখন ক্লান্ত থাকতাম, সে আমার জন্য ছিল সান্ত্বনার বাতাস। সে যখন হতাশ, আমি তার জন্য ছিল অন্ধকারে আলো। আমরা জীবন যুদ্ধে একসাথে লড়েছি, একে অপরকে বাঁচিয়েছি।
গ্রামের মানুষ আমাদের সম্পর্ক দেখত শ্রদ্ধায়। কেউ কেউ প্রথমে ভেবেছিলো এটা অস্বাভাবিক, কিন্তু পরে বুঝতে পারল যে ভালোবাসা সব সীমা পেরিয়ে যেতে পারে।
একদিন গ্রামের বড়লোক গিয়ে বলল, “তোমাদের এই সম্পর্ক সত্যিকারের প্রেমের গল্প। এটা আমাদের গ্রামকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।”
আমাদের জীবনের প্রতিটি দিন কেটে গেছে ভালবাসা আর শ্রদ্ধায়। আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছে, আর আমরা দেখছি তাদের মধ্যে আমাদের গল্পের প্রতিফলন।
বিয়ের পর থেকে আমি কখনো ভাবিনি যে চাচাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হবে। সে শুধু আমার স্ত্রী নয়, আমার জীবনের সেরা বন্ধু, আমার আত্মার অর্ধেক।
আমাদের গল্প হয়েছিল পারিবারিক সম্পর্ক আর প্রেমের মেলবন্ধন। যেখানে পরস্পরের জন্য সম্মান, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বন্ধন সবচেয়ে শক্তিশালী।
চাচাতো বোনের সাথে বিয়ে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
40
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating