আই লাভ ইউ মেঘ ভাইয়া

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
আমাদের গ্রামের নাম ছিল বসন্তপুর। ছোট্ট একটা গ্রাম, যেখানে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাথর, প্রতিটি নদীর কলকল ধ্বনি যেন জীবন্ত। সেই গ্রামে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল আমার মেঘ ভাইয়া—মেঘাময়, শক্তি আর স্নেহের এক অপরিমেয় মিশেল।

মেঘ ভাইয়া ছিল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ছেলেবেলায় তার কপালে ছিল সেই চিরচঞ্চল মেঘের মতো মেঘলা দাগ, তাই সবাই তাকে মজার ছলনা দিয়ে ডাকতো ‘মেঘ ভাইয়া’। কিন্তু তার চোখে ছিল আকাশের মতো বিশাল মায়া, আর হাসিতে ঝরত এক অভূতপূর্ব শান্তি। ছোটবেলায় যখন মা-বাবা কিছুতেই বুঝতে পারত না, তখন মেঘ ভাইয়া এসে আমার হাত ধরে বলত, “ভয় পেও না, আমি আছি।”

আমার ছোট হাতগুলো যখন দুঃখে ভরে উঠত, সে জড়িয়ে ধরত আর বলে, “পাখি, তুমি একা নও, আমি আছি।” সে কখনো কোনো কথা ফাঁকি দিত না, কখনো হার মানত না। তার সেই সাহস আমার জন্য এক দীপশিখা হয়ে জ্বলত।

বছর কেটে গিয়েছিল। আমার ছোট্ট মনেও বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন জাগ্রত হল। কিন্তু তখন থেকেই গ্রামের পাশে ঝড়ের মেঘ জমতে শুরু করল।

এক বিকেলে, যখন আকাশ কালো হয়ে উঠেছিল, ওরা বলল, “আগামীকাল বন্যা আসছে। সবাই সাবধান।” আমরা সবাই আশঙ্কায় থাকলাম। কিন্তু মেঘ ভাইয়া ছিল সবার থেকে বেশি দৃঢ়। সে বলল, “আমাদের গ্রাম, আমাদের পরিবার, আমরা হারাবো না।”

রাত বেলা বৃষ্টির শব্দে আমাদের ঘর কাঁপছিল। বন্যার পানি ক্রমশ বাড়ছিল, গ্রামের মাটিকে ধেয়ে নিচে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তখন ছোটবেলার সেই ভয়কে অনুভব করছিলাম, যা কেউ বুঝতে পারত না। সেই ভয় যেন আমার সমস্ত রক্তের স্রোতকে জমাট করে দিল।

তবে, আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল মেঘ ভাইয়া। তার চোখে ছিল অদম্য প্রত্যয়, আর মুখে বলছিল, “পাখি, আমি আছি।”

সে রাত আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাত ছিল। বন্যার পানি বাড়তে থাকল, কিন্তু মেঘ ভাইয়া গ্রামের সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে একে একে সবাইকে ডেকে নিয়ে গেল। ঘর থেকে ঘর ছুটে সবাইকে পাহারা দিল, বাঁধ বানাতে সাহায্য করল।

সেই সময় আমি বুঝতে পারলাম, মেঘ ভাইয়া কেবল আমার ভাই নয়, সে আমার জীবনের সেই মেঘ, যা ঝড়ের মাঝেও আকাশকে ঢেকে রক্ষা করে।

দিনের পর দিন কাটল। বন্যার পানি কমতে শুরু করল, কিন্তু গ্রাম তখন মর্মান্তিক অবস্থায় পড়েছিল। বাড়িঘর, মাঠ আর রাস্তা—সব কিছু ভেঙে পড়েছিল। সবাই হতাশ, কেউ কেউ হেরে যাচ্ছিল।

কিন্তু মেঘ ভাইয়া হাল ছাড়েনি। সে বলল, “আমাদের আবার শুরু করতে হবে। আমরা আবার বসন্তপুরকে ফিরে আনব।”

তার সেই কথাগুলো ছিল সবার হৃদয়ে এক নতুন আশার আলো। গ্রামের সবাই মিলে কাজ শুরু করল। মেঘ ভাইয়ার নেতৃত্বে আমাদের গ্রাম আবার ধীরে ধীরে গড়ে উঠল। সে তার নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সবার পাশে দাঁড়াল।

আমার জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোতে মেঘ ভাইয়ার নাম সবসময় প্রথম। যখনই আমি হতাশ হতাম, সে আমার পাশে এসে বলত, “ভাইয়া, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি আছি।”

একদিন সন্ধ্যায়, আমরা নদীর ধারে বসে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলাম। সে হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “পাখি, তুমি জানো? আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার ভালোবাসা ছাড়া আমার জীবন শূন্য।”

আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বললাম, “ভাইয়া, আমি তোমাকে ‘ভাইয়া’ বলে ডাকলেও, তোমার ভালোবাসা আমার জীবনের সবথেকে বড় প্রেরণা।”

সে হাসল, সেই হাসি যেন আকাশের মেঘ ছিড়ে সূর্যের আলো ছড়িয়ে দেয়।

তারপর থেকে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। সে শুধু আমার ভাই না, আমার জীবনের সেই নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে আমি সবসময় ফিরে আসি।

আজও যখন আকাশ মেঘলা হয়, আমার মনে হয় মেঘ ভাইয়া আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, বলে দিচ্ছে, “ভয় করো না, আমি আছি।”
40 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: