সিয়াম আহমেদের নতুন সিনেমার জন্য একটা গল্প দরকার। সেটার প্লটে হোক একটা গ্রামীণ পটভূমি, যেখানে আধুনিক ও প্রকৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে, আর সেখানে একটি জংলি—অর্থাৎ বন্যপ্রাণী বা বন্য মনস্ক একজন চরিত
গ্রামের নাম ছিল ঝরনা ফুল। চারদিকে ঘেরা ছিল নৈসর্গিক বন আর পাহাড়, নদী ও চায়ের বাগানের মাধুর্যে মিশে থাকা। ঝরনা ফুল গ্রামের মানুষগুলো সাধারণ জীবনে সুখী, তাদের দিনগুলো চলে প্রকৃতির ছায়ায়। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে বন থেকে এল এক ভয়ংকর জংলি। জংলি শুধু পশুপাখি নয়, তার চেয়ে বড় ছিল মানুষের মনুষ্যত্বের বাইরে থাকা এক অদ্ভুত বুনো মন। সে গ্রামের আশেপাশের মানুষদের জন্য এক আতঙ্কের নাম।
মুসা—একজন তরুণ গ্রামবাসী—তার গরু নিয়ে হাটে যাচ্ছিল। গরুগুলো চরাতে নিতে তার বাড়ি থেকে অনেক দূর যেতে হয়, সেই পথে বন পাশ দিয়ে হাঁটতে হয়। মুসা জানত, জংলির ব্যাপারে গ্রামের সবাই কতটা ভয় পাচ্ছে। কিন্তু সে নিজের সাহস নিয়ে চলেছিল। তার একমাত্র চিন্তা ছিল গরুগুলো যেন বাঁচে।
হঠাৎ গাছের ছায়ায় কিছু শব্দ পেল সে। পেছন ফিরে তাকানোর আগেই একটা গর্জন, একটা কর্কশ আওয়াজ তার শরীর ছুঁয়ে গেল। তার গরু চমকে ছুটে গেল। মুসা নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছিল, সেই সময়ে একটা কালো মায়াবী ছায়া তার সামনে এসে দাঁড়াল। সেটা ছিল জংলি।
জংলি মানুষের মতো বুদ্ধিমান কিন্তু একদম অমানবিক রূপ ধারণ করেছিল। তার চোখে জ্বলছিল আগুনের মতো দীপ্তি, মুখে ছিল এক অবর্ণনীয় রাগ আর বুনোত্ব। সে ছিল বন আর মানুষদের মধ্যকার সেতুবন্ধন ভাঙিয়ে দিতে আসা এক দুর্বৃত্ত। গ্রামের যারা বন থেকে তাদের কাণ্ডকারখানা জানতো, তারা বলত—জংলি আসলে বনবাসীর এক প্রেতাত্মা, যা মানব সমাজের লোভ আর অবিচারের প্রতিফলন।
মুসার গরুগুলো ছুটতে লাগল। সে চিৎকার করে ডাকল, “জংলি! রে, বাড়ি চলে যা। আমরা তোমায় কোনো ক্ষতি করব না।”
জংলির চোখে ছিল কোনো দয়া নেই। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল মুসার দিকে। মুসা বুঝতে পারল যে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় শুধু একটাই—বেগতিক দৌড়ানো। সে দৌড়াতে লাগল, তবুও জংলি তার থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ মুসার পা পিছলে গেল, সে মাটিতে পড়ে গেল। জংলি তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সেই মুহূর্তে মুসার পেছন থেকে এক শাব্দ এলো, “রে, ছেড়ে দে মুসাকে!” কেউ চিৎকার করছিল। মুসা দেখতে পেল তার ছোট ভাই রব্বান এসে ছুরি হাতে জংলির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে বলল, “আমরা মানুষ, বনে বসবাস করি। আমাদের ভুল ধরিয়ে দাও, মারো না।”
জংলি একটু থমকে গেল। সে যেন বুঝতে পারল যে শুধু রাগ আর প্রতিহিংসায় পৃথিবী চলতে পারে না। সে হঠাৎ করে পিছু হটে গেল আর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মুসা ও রব্বান তখন ভয় পেয়েও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলল, “জংলি আসলে কে? আমরা কী করব?”
রব্বান বলল, “দেখো ভাই, এই জংলি একটা বুনো প্রাণীর মতো নয়, বরং একটা মানুষ, যাকে কেউ ভুল বুঝছে। আমাদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো, তার কথা শোনা।”
তারপর গ্রামের পুরাতন বুড়ো মানুষ আমিন বাবু তাদের কাছে এল। আমিন ববু বলল, “এই জংলি আসলে আমাদের অতীতের একটা যন্ত্রণার রূপ। বনে থাকা এক যুবক, নাম ছিল রতন, সে এক সময় আমাদের গ্রামের ছিল। কিন্তু গ্রামের অন্যায় আর অবিচারে সে বনে চলে গিয়েছিল, তার মন দুর্বল হয়ে গিয়েছিল বন্যতার মাঝে। এখন সে জংলি হয়ে ফিরে এসেছে।”
মুসা ও রব্বান ভাবতে লাগল, “কীভাবে আমরা রতনকে বাঁচাতে পারি?”
তাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো। তারা ঠিক করল, প্রথমে রতনকে খুঁজে বের করতে হবে, তার সাথে কথা বলতে হবে, তার যন্ত্রণার কারণ বুঝতে হবে। তারা একসাথে বনের গভীরে প্রবেশ করল। বনের গাছগুলো যেন তাদের আশীর্বাদ দিচ্ছিল, পাখির কিচিরমিচিরও যেন একটা আশা জাগাচ্ছিল।
বনে যাওয়ার পথে তারা দেখল, জংলির পায়ের ছাপ, গাছের নীচে ছড়িয়ে থাকা কিছু পুরনো কাপড় আর বইয়ের কিছু টুকরো। সেই বইগুলো ছিল গ্রামের ইতিহাস, যেখানে রতনের নাম লেখা ছিল একটি অত্যাচারী চরিত্র হিসেবে।
মুসা রীতিমতো অবাক হলো। সে বলল, “আমাদের বোনেরা ভুল করেছে। রতন কোনো অপরাধী নয়, বরং তারা তাকে ভুল বুঝেছে।”
রব্বান বলল, “আমাদের অবশ্যই তাকে খুঁজে বের করে তার দুঃখ মুছতে হবে।”
একদিন রাতে তারা জংলির সন্ধানে বনের ভেতর গিয়ে একটা ঝর্ণার কাছে পৌঁছাল। সেখানে দেখল একজন যুবক বসে আছে, যার চোখে বেদনার জল আর গায়ে জংলির মতো কালো পোশাক, কিন্তু তার চেহারা মানুষের মতোই।
“রতন?” মুসা ধীরে ধীরে বলল।
যুবক মাথা তুলে বলল, “হ্যাঁ, আমি রতন। আমি জংলি, কিন্তু আমি মানুষ। আমি বাঁচতে চাই।”
রতনের মুখে ছিল এক গভীর বেদনা, সে বলল, “আমাকে যারা জানতো, তারা আমাকে ত্যাগ করেছে। আমি তাদের থেকে পালিয়ে বনে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু আমার মন চায় মানুষের মতো বাঁচতে।”
মুসা বলল, “আমরা তোমাকে সাহায্য করব। আমরা গ্রামের সবাইকে বলব তোমার সত্যি কথা।”
রতন বিশ্বাস করল। তারা ফিরে এল গ্রামে। মুসা ও রব্বান গ্রামের সকলের সামনে রতনের সত্যি কাহিনী বলল। শুরুতে গ্রামের অনেকেই সন্দেহ করেছিল, কিন্তু পরে সবাই বুঝতে পারল যে রতন নিঃসন্দেহে নিরীহ একজন মানুষ, যাকে ভুল বোঝা হয়েছিল।
গ্রামবাসী একযোগে রতনের পাশে দাঁড়াল। তাদের সেই বুনো মনুষ্য রূপান্তরিত হলো মানবিক ভালোবাসায়। রতনের চোখে ঝলমল করল নতুন আশা।
পরের দিন থেকে ঝরনা ফুল গ্রামের বনে আর কোনো আতঙ্ক ছিল না। জংলি আর মানুষ—যারা কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না বলে মনে করত—তারা মিলেই নতুন এক ইতিহাস রচনা করল।
রতনের গল্প হয়ে উঠল গ্রামবাসীর জন্য এক অনুপ্রেরণা। সে শিখিয়েছিল, আমাদের সমাজে যত বড় অপরাধ বা ভুল হোক না কেন, ভালোবাসা আর বিশ্বাসই পারে সেই বন্ধন ভাঙিয়ে দিতে।
---
গল্পের শেষে দেখা গেল, ঝরনা ফুল গ্রাম এখন শান্তি ও সুরক্ষায় ভরা, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি একসাথে সমান মর্যাদায় বাস করে। আর মুসা, রব্বান ও রতন—তারা সবাই হয়ে উঠল এক নতুন যুগের দূত।
জংলি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
33
Views
5
Likes
0
Comments
0.0
Rating