দিলের বন্ধন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
কারো কাছ থেকে দূরে, লাহোরের ব্যস্ত রাস্তার এক ছোট্ট ক্যাফেতে, বসেছিল এক ছেলের হাসি—যা ছিল স্বপ্নের মতো মিষ্টি, অথচ চোখে একটা অদ্ভুত বিষাদ। নাম তার আরশ। আরশ ছিল পেশায় একজন ফটো সাংবাদিক, যার জীবনটাই কাটত ক্যামেরার লেন্সের মধ্যে দিয়ে। সে দেখতে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে এক আশ্চর্য গভীরতা ছিল, যা কেউ সহজে ধরতে পারত না।

একদিন, ক্যাফেতে ঢুকতেই তার চোখ পড়ল এক মেয়ের দিকে। মেয়েটি বসেছিল কোণে, বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল। তার চোখ ছিল যেন কোনো রূপকথার রাজকুমারীর মতো—দুর্দান্ত সৌন্দর্যের ছোঁয়া, আর সঙ্গে একটা চঞ্চলতা, যা মানুষকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে যেত। মেয়েটির নাম ছিল জেনাত।

জেনাত ছিলেন এক উচ্চ শিক্ষিত তরুণী, যিনি সমাজের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে কাজ করতেন। লাহোরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় থেকেই সমাজসেবা ও লেখালেখিতে তার মুগ্ধতা। আরশ প্রথম দেখাতেই তার মনের এক কোণে জেনাতের জন্য একটা আলাদা জায়গা তৈরি হয়।

দিন গড়ানোর সাথে সাথে, ক্যাফেতে আসা-যাওয়া বাড়তে থাকে তাদের। আরশ ক্যামেরার মাধ্যমে জেনাতের প্রতিটি হাসি ও ভাবের ছবি তুলে রাখে, আর জেনাত আরশের চোখে নিজের ভালোবাসার গল্প খুঁজে পায়। একদিন, জেনাত আরশের সামনে নিজের জীবনের সেই সব কাহিনি খুলে ফেলে যা তাকে এতটা শক্তিশালী করে তুলেছে।

জেনাতের বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকুরে, যিনি কঠোরভাবে তার মেয়েকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরিবারের পুরনো কনসারভেটিভ মানসিকতা জেনাতকে প্রায় দমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল স্বাধীন, নিজের মত করে বাঁচার—কোনো বাঁধা ছাড়াই। আরশের সাথে কথা বললে সে নিজের জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো ভাগ করে নিত।

আরশ বুঝতে পারে যে জেনাতের জীবনে শুধু প্রেম নয়, তার জন্য লড়াই করাও জরুরি। সে প্রতিজ্ঞা করে, যেন সে তার পাশে থাকবে সবসময়। তারা একসাথে লাহোরের পুরানো বাগান, ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ঘুরে বেড়ায়, আর তাদের মধুর স্মৃতি জমে উঠে দিনের শেষে।

কিন্তু জেনাতের পরিবারের চাপ বাড়তে থাকে। বাবা জেনাতের পড়াশোনা ছেড়ে বর কোথাও বেছে নেবার জন্য জোর করেন। জেনাত জানে, সে আরশকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না, কিন্তু পরিবারের সম্মান ও ভালোবাসার মাঝে সে ভেঙে পড়ে। একদিন, সে আরশকে বলে, "আমাদের ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে বাধা তো আসবেই। আমাদের তা সামলাতে হবে একসাথে।"

এমন সময়ে, আরশের কাজের জন্য তাকে করাচি যেতে হয়। দূরত্ব তাদের প্রেমকে কঠিন পরীক্ষা দেয়। তবে তারা প্রতিদিন ফোনে কথা বলে, ইমেইল বিনিময় করে, যেন দূরত্ব তাদের মনের দূরত্ব কমায়।

করাচিতে আরশ এক বড় কাজের সুযোগ পায়। সেখানে সে প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে, যার মাধ্যমে সে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব আরও মজবুত করে। জেনাতকে সে প্রতিশ্রুতি দেয়, "আমি তোমার জন্য সবকিছু করব, তোমার স্বপ্ন পূরণ করব।"

কিন্তু করাচি থেকে ফেরার পথে, আরশের জীবনে একটা অপ্রত্যাশিত ঝড় আসে। তার পিতা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর তাকে অবিলম্বে বাড়ি ফিরতে হয়। জেনাত তাকে সাহস যোগায়, "যেখানে আমি আছি, তোমার পেছনে আছি। পরিবারের যত্ন নাও, আমি অপেক্ষা করব।"

অবশেষে, আরশের বাবা সুস্থ হয়, আর সে আবার লাহোর ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এসে সে দেখে, জেনাত অনেকটাই বদলে গেছে—মনে একটা দুঃখের ছায়া, যা সে আগে কখনো দেখেনি।

জেনাত জানায় যে তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে চায় এক সমৃদ্ধ ব্যবসায়ীর সঙ্গে, যার নাম ফয়েজ। ফয়েজ ছিলেন লাহোরের প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে, যার পরিচিতি ছিল রীতিমতো প্রভাবশালী ও কঠোর। জেনাত জানে, এটা তার জীবনের শেষ সুযোগ হতে পারে স্বাধীনভাবে বাঁচার, আর সে আরশের জন্য লড়াই করতে চায়।

আরশ আর জেনাত সিদ্ধান্ত নেয়, তারা পালিয়ে যাবে, কোনো ভাবে তাদের ভালোবাসাকে বাঁচাবে। এক রাতে, তারা লাহোরের গোধূলি সময়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়, একসাথে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করার জন্য।

পালানোর পথে তারা নানা বাধার মুখোমুখি হয়। পুলিশের হেফাজতে পড়ার ভয়, জেনাতের পরিবারের লোকজনের অনুসরণ, আরশের পিতার অসুস্থতার কারণে মনের অবসাদ সব মিলিয়ে তাদের জীবন যেন এক রোমাঞ্চকর অভিযানে পরিণত হয়।

কিন্তু তাদের প্রেমের শক্তি তাদের একসাথে রাখে। এক রাতে, তারা কোনো একটা পরিত্যক্ত গ্রামে পৌঁছে যায়, যেখানে তারা ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নিয়ে নতুন জীবন শুরু করে। সেখানে তারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে—জেনাত লেখালেখি শুরু করে আর আরশ ছবি তোলার কাজ চালিয়ে যায়।

তাদের জীবনে আসে ছোট ছোট সুখের মুহূর্ত—একসাথে রান্না করা, গল্প বলা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা। কিন্তু তবুও, জেনাতের মনে একটা ভীতির ছায়া লেগে থাকে—তার পরিবার তাদের খুঁজে পাবে, বা তাদের এই নতুন জীবন টেকবে কি না।

একদিন, জেনাতের বাবা তাদের খুঁজে পায়। পরিবারের লোকজন এসে তাদের ঘর ভেঙে ফেলে। এই মুহূর্তে, আরশ নিজের জীবনের সব শক্তি জোগাড় করে জেনাতকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে।

সবচেয়ে ক্রমাগত মুহূর্তে, আরশ আর জেনাত একটি বড় পার্কের মধ্যে পৌঁছায়, যেখানে তারা প্রকাশ্যে তাদের প্রেমের কথা ঘোষণা করে। তারা জানিয়ে দেয় যে তাদের ভালোবাসা অবিচ্ছেদ্য, এবং তারা কোনো শর্ত ছাড়াই একসাথে থাকতে চায়।

এই সাহসিকতার জন্য, সমাজে ধীরে ধীরে তাদের প্রেমের প্রতি সহানুভূতি বেড়ে যায়। জেনাতের বাবা নিজেও তাদের কাছে মৃদু হয়ে আসে, বুঝতে পারে যে মেয়ের ভালোবাসাকে কেউ বাধা দিতে পারে না।

শেষে, আরশ আর জেনাত পরস্পরের হাতে হাত রেখে নতুন জীবনের পথে হাঁটে—যেখানে প্রেমের বন্ধন হয় শক্তিশালী, বেদনা ছাপিয়ে, ভবিষ্যতের আলোয় জ্বলজ্বল করে।
31 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: