তোমার হাসি আমার সুখ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রানাঘাট স্টেশনের পাশ দিয়ে গঙ্গার পাড় ঘেঁষে যে সরু রাস্তা চলে গেছে গ্রাম্য বসতির ভেতর, সেই পথেই প্রতিদিন হাঁটে রাহিন। ছেলেটা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে এখন নদিয়ার এক প্রাইভেট কলেজে পড়ে। সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, হাতে থাকে একটা হেলমেট, বুকের মাঝে ছোট্ট একটা খাতা—যেখানে লেখা থাকে তার দিনের কাজগুলো।

রাহিনের বাবা ছিলেন কসাই, কিন্তু ছেলে পড়াশোনায় ভালো। তাই মা চেয়েছিল, ছেলেটা যেন বাবার মতো না হয়। সে জন্যই অনেক কষ্ট করে তাকে স্কুলে পাঠিয়েছেন, তারপর কলেজে। রাহিন জানে, তার ঘামে মা ভাত খান, তাই সে কখনো হাল ছাড়ে না।

গল্পটা একদম সাধারণ ছিল, যতক্ষণ না সে দেখে সেই মুখটা—নীল শাল ও সাদা সালোয়ার-কামিজে ঢাকা এক মুখ, যেখানে কপালে পড়েছে একটা ছোট্ট কালো টিপ। সেই হাসিটা যেন সরাসরি তার বুক ভেদ করে ভিতরে গিয়ে বসে।

— “তোমার নাম কী?”

রাহিন প্রথমবার এই প্রশ্নটা করেছিল কলেজের ক্যান্টিনের পাশে, খুব ধীরে, খুব থেমে।

মেয়েটার নাম রাহিলা। ইসলামপুর থেকে প্রতিদিন ট্রেনে আসে পড়তে। সে ইতিহাস নিয়ে পড়ছে, আর রাহিন পড়ছে দর্শন। তারা প্রথমে বন্ধুত্ব করে, তারপর সেই বন্ধুত্বে গন্ধ পায় প্রেমের।

রাহিন যখন মায়ের হাতে পিঠা তুলে দেয়, তখন চোখে ভাসে রাহিলার মুখ।
রাহিলা যখন জানালার ধারে বসে বই পড়ে, তখন বাতাসে ভেসে আসে রাহিনের সাইকেলের ঘণ্টা।

কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে তারা একসাথে নদিয়ার এক মাজারে গিয়েছিল, নামাজ পড়েছিল পাশাপাশি। তারপর বসেছিল বটগাছের ছায়ায়, আর সেখানে রাহিন বলেছিল—

— “তোমার হাসি আমার সুখ, রাহিলা। তুমি হাসলে আমি বাঁচি।”

মেয়েটা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিয়েছিল। সে কিছু বলেনি, কিন্তু পরদিন একটা চিঠি পাঠিয়েছিল—

"রাহিন, আমার হাসি শুধু তোমার জন্য। তুমি পাশে থাকলে আমি বাকি জীবনটা হাসিমুখে কাটাতে পারব।"

তাদের প্রেমটা ছিল সরল, সরল নদীর মতো। কিন্তু সমাজ! সমাজ কখনো সরলতা মেনে নেয় না।

রাহিলার বাবা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। প্রথাগত ও ধর্মনিষ্ঠ, কিন্তু খুব কঠোর। তিনি কখনো মেয়েকে কলেজে পাঠাতে চাননি। মা জোর করায় অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেম? তাও রাহিনের মতো একজন গরিব ছেলের সাথে?

খবরটা জানাজানি হতেই প্রথমে বন্ধ হয় মোবাইল, তারপর কলেজ যাওয়া। রাহিন ছটফট করে। সাইকেল নিয়ে যায় ইসলামপুর, কিন্তু গেটের বাইরে তাকে থেমে যেতে হয়।

একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ রাহিলা তার বাড়ির পেছনের বাগানে দাঁড়িয়ে রাহিনকে দেখে। দু’জনের চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে সাহস।

— “তুমি পালিয়ে চলো আমার সাথে,” বলে রাহিন।

রাহিলা চমকে যায়। সে চায় ভালোবাসা, কিন্তু নিজের পরিবারকে ছেড়ে? ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়েটা দ্বিধায় পড়ে।

— “একটু সময় দাও আমাকে।”

সেই ‘একটু সময়’ আর ফুরায় না। পরদিনই বাবা ঠিক করে ফেলেন তার বিয়ে, এলাকার একজন ধনী ছেলের সাথে—যার নাম সায়েম। ধর্মচর্চা করে, ব্যবসাও আছে। বয়সে দশ বছর বড় হলেও তাতে কিছু যায় আসে না, ‘ভালো ছেলে’ বলেই মেনে নেন সবাই।

রাহিলার চোখে ঘুম নেই। মা জানে মেয়ের মন ভেঙে গেছে, কিন্তু মুখ খোলে না।

এদিকে রাহিন একরকম ভেঙে পড়ে। একদিন মাঝরাতে সে চিঠি লিখে রাখে তার খাতার পাতায়—

"তুমি যদি হাসো, আমি বেঁচে থাকব। যদি না হাসো, তাহলে আমি আর নিজের জন্য বাঁচব না।"

রাহিলা পড়ে সেই চিঠি। বিয়ের আগের রাত। আকাশে ঝড় আসছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও কাঁদছে তার সাথে।

সেই রাতেই সে চুপিচুপি বেরিয়ে আসে। গেট পেরিয়ে, অলিগলি পেরিয়ে পৌঁছে যায় রানাঘাট স্টেশনে। সেখানেই রাহিন অপেক্ষা করছিল, অন্ধকারে, ভয়ে, ভালোবাসায়।

— “তুমি আসবে জানতাম,” রাহিন বলে।

— “তুমি না থাকলে আমার হাসি থাকবে না,” রাহিলা ধীরে বলে।

তারা ট্রেনে উঠে পড়ে। গন্তব্য কলকাতা। সেখানেই এক পরিচিত বড় ভাইয়ের কাছে আশ্রয় পায়। রাহিন কাজে ঢুকে পড়ে একটা বইয়ের দোকানে, আর রাহিলা ভর্তি হয় আরেকটা কলেজে।

দিন যায়। মাস পেরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে তারা গড়ে তোলে তাদের ছোট্ট সংসার। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু ভালোবাসা আছে, শান্তি আছে।

একদিন সকালবেলা রাহিন ঘুম ভেঙে দেখে, রাহিলা আয়নায় নিজের চুল বাঁধছে, মুখে একফোঁটা হাসি।

— “তুমি হাসছো?”

রাহিলা ঘুরে তাকায়। চোখে জল জমে আছে, কিন্তু ঠোঁটে সেই পুরনো হাসি।

— “হ্যাঁ, কারণ তুমিই তো বলেছিলে—তোমার হাসি আমার সুখ।”

সেই মুহূর্তটা যেন সময়কে থামিয়ে দেয়। রাহিন এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে, কপালে একটা চুমু খায়।

দুজন মিলে ছাদে ওঠে। ওপরে নীল আকাশ, পাখির ডাক, আর দু’জন মানুষের ভালোবাসার কথা—যা সমাজের চোখ এড়িয়ে এক সুন্দর সংসারে রূপ নিয়েছে।

হয়তো রাহিলা তার বাবার চোখে ‘অবাধ্য মেয়ে’, কিংবা সমাজের চোখে ‘পালানো বউ’—কিন্তু রাহিনের চোখে সে স্রেফ একজন নারী, যে হাসলে সে বাঁচে, যে কাঁদলে সে ভেঙে পড়ে।

ভালোবাসা হয়তো অনেক কিছু হারায়, কিন্তু যদি সেই ভালোবাসায় থাকে আত্মত্যাগ, যদি থাকে নির্ভরতা—তাহলে সেটা হারিয়ে যায় না, থেকে যায়...

একটা মুচকি হাসিতে, একটা অর্ধচন্দ্র চোখে, একটা সকালবেলার আলোয়—

আর কোনো এক তরুণ প্রেমিকের চোখে জ্বলতে থাকা আশাতে...
35 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: