ডার্ক-ডেভিল

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাত তখন বারোটা পঁইত্রিশ।
ঢাকার একটি পুরনো এলাকা—শাঁখারীবাজার।
সব দোকান বন্ধ, গলিগুলো ফাঁকা, মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক শোনা যায়।
ঠিক এমন সময়, একটা ছায়া গলে যায় এক পুরনো চারতলা বাড়ির ছাদের মধ্যে।
সেই ছায়ার নাম কেউ জানে না।
লোকেরা ডাকে—“ডার্ক-ডেভিল”।

কিন্তু এই গল্পটা শুধু একটা অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের নয়।
এই গল্পটা এক অভিশপ্ত প্রাণ, এক প্রতিশোধ, এক অন্ধকারকে আলোর সামনে দাঁড় করানোর সংগ্রামের।


---

অধ্যায় ১: হারানো মানুষ

তন্ময় চৌধুরী একজন অপরাধ রিপোর্টার।
তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে অপরাধের পেছনে ছুটে।
তবে আজকাল তার চোখে ঘুম আসে না।
কারণ, গত ছয় মাসে শাঁখারীবাজারের ৯ জন মানুষ অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তারা গরিব, রাস্তার পাশের দোকানদার, বৃদ্ধ মুচি, এক ভবঘুরে বাউল—কিন্তু সবাই রাতে হারিয়ে গেছে।

পুলিশ বলছে, গ্যাং-লর্ডদের কাজ।
কিন্তু তন্ময় জানে, এটা গ্যাং নয়—এটা কিছু অন্যরকম।

এক রাতে, সে নিজেই নজর রাখে পুরনো ভাঙা রায়চৌধুরী ভবনের দিকটায়।
হঠাৎ দেখে একটা লোক ছুটে যাচ্ছে, তাকে অনুসরণ করতেই রায়চৌধুরী বাড়ির সামনে সে মুখোমুখি হয় তার—

একটা ছায়া।
চোখ দুটো লাল, গায়ে আগুনের ছোপ, মুখ ঢেকে রেখেছে কালো হুডে।
আর হাত দুটো লম্বা, নখের জায়গায় আঁচড় বসানোর মতো ধাতব ছুরি।

তন্ময় তখন কিছুই বুঝে ওঠার আগেই পড়ে যায় মাটিতে।

সে যখন জ্ঞান ফিরে পায়, চারদিক অন্ধকার।
তার শরীরের পাশ দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বইছে, আর দূরে একজন নারীর কণ্ঠ—
“ও ফিরে এসেছে। অভিশাপ মুক্ত করতে নয়, প্রতিশোধ নিতে।”


---

অধ্যায় ২: অভিশপ্ত অতীত

১৯৭১ সালে, এই শাঁখারীবাজারেই ঘটে এক ভয়ানক কাহিনি।
তৎকালীন পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো।
রায়চৌধুরী বাড়িতে তখন ছিলেন পুরোহিত বিনয়চন্দ্র, তার স্ত্রী এবং তার ছোট ভাই অরূপ।

তাদের ধরে নিয়ে যায় সৈন্যরা।
বিনয়চন্দ্রকে বলা হয়—
“তোমার দেবতা যদি সত্যি হয়, তোমার ভাইকে বাঁচাও।”

বিনয়চন্দ্র চুপ থাকেন।
তার সামনে অরূপকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

অরূপের মুখে তখন একটাই কথা—
“ভাই, তুমি চুপ কেন? আমাকে বাঁচাও!”

তার পর থেকে শোনা যায়, রায়চৌধুরী বাড়ির মেঝেতে রাতের বেলা হাঁটার শব্দ হয়।
একটা ছায়া নাকি ঘুরে বেড়ায়…
আর সে চিৎকার করে বলে—
“ডাকো না আমাকে… ডাকলেই আসব…”


---

অধ্যায় ৩: ফিরে আসা

তন্ময় ঘটনাগুলো নিয়ে গভীরভাবে খোঁজ শুরু করে।
পুরনো দলিল, লোককথা, এবং রায়চৌধুরী বাড়ির তলার পুরোনো ভাড়াটিয়াদের বক্তব্য মিলে একটাই নাম উঠে আসে—

অরূপ রায়চৌধুরী।

তার মরণের পরে কেউ তার দাহ করেনি, কেউ শ্রাদ্ধ করেনি।
সে এক অর্ধেক-আত্মা হয়ে গেছে—না মৃত, না জীবিত।
সে অন্ধকারের শক্তিকে ডেকে এনেছে নিজের দেহে।
সে এখন ডার্ক-ডেভিল।

তন্ময় বুঝতে পারে—এই অস্তিত্বের কাছে যুক্তি চলে না।
প্রতিটি খুনের পেছনে একটি প্যাটার্ন—
তারা সবাই ছিল ৭১-এ বিশ্বাসঘাতকদের বংশধর!
এবং সবাই কোনো না কোনোভাবে সেই ঘটনার সাথে জড়িত ছিল, কিংবা উত্তরসূরি ছিল।


---

অধ্যায় ৪: সীমানা ভাঙার রাত

এক রাতে, তন্ময় নিজেই ডার্ক-ডেভিলকে সামনে থেকে দেখে।
সে বলে—
“তুমি কি প্রতিশোধ নিতে এসেছো?”

ডার্ক-ডেভিল উত্তর দেয় না।
শুধু তার চোখদুটি আরও লাল হয়ে ওঠে।
তন্ময় বলে,
“তোমার দেহ হয়তো পুড়েছিল, কিন্তু আত্মা এখনো জ্বলছে।
তুমি শান্তি পাবে না, যদি প্রতিশোধ নিতে থাকো।
তুমি রাক্ষস হয়ে যাচ্ছো অরূপ।
তুমি মানুষ ছিলে একদিন, ভাইকে বাঁচাতে চেয়েছিলে, এখন তুমি সবার ভাই কেড়ে নিচ্ছো।”

ডার্ক-ডেভিল থেমে যায়।
কিছুক্ষণের জন্য বাতাস স্তব্ধ।
তন্ময় বলে,
“তোমাকে দাহ করতে হবে।
তোমার আত্মা মুক্তি চায়, প্রতিশোধ না।
তুমি মানুষ ছিলে। এখনো পারো।”

ডার্ক-ডেভিল কিছু বলে না।
শুধু এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে তার লাল চোখ থেকে।


---

অধ্যায় ৫: দাহ ও দানবের প্রস্থান

তন্ময় ও একজন তান্ত্রিক মিলে রায়চৌধুরী বাড়ির মেঝে খুঁড়ে পায় সেই কঙ্কাল।
তাতে তখনো হালকা আগুনের দাগ, সেই ধাতব ছুরির মতন আঙুলের হাড়।
একটি তামার থালায় রেখে তার দাহের আয়োজন হয় গঙ্গার ঘাটে।

চারদিকে কালো মেঘ।
বাতাস থেমে গেছে।
দূরে বাজ পড়ছে।

তন্ময় যখন অগ্নি প্রজ্বালন করে, তখন হঠাৎ আকাশ থেকে নামে এক ধুলোঝড়।
তার মাঝখানে দেখা যায়—ডার্ক-ডেভিল ধীরে ধীরে হাঁটছে অগ্নির দিকে।

সে দাঁড়ায় আগুনের পাশে।
তন্ময়ের চোখে চোখ রেখে সে বলে—
“তুই আমাকে বুঝলি। তাই আজ শান্তি নিয়ে যাচ্ছি।
তবে মনে রাখিস—অন্যায়ে যারা জ্বলে ওঠে, তারা সবসময় দানব হয় না।
তারা অনেকে মানুষ হয়ে মরেও ফেরে।”

তারপর আগুনে ঢুকে পড়ে ডার্ক-ডেভিল।

তখনি চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে।
আকাশে একটা চিৎকার ভেসে আসে—
“আমি মুক্ত!”


---

শেষ অধ্যায়: চুপচাপ বাতাস

আজ শাঁখারীবাজার শান্ত।
তন্ময় মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে দেখে রায়চৌধুরী বাড়ির ছাদে।
সেখানে আজ আর কোনো ছায়া নেই।

কিন্তু রাত বারোটার পরে হালকা বাতাস এলে শোনা যায় এক গলার ধ্বনি—
“ভুলেও যেন কেউ বিশ্বাসঘাতক না হয়…”
60 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: