সর্দার বাড়ির ভূত

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
শ্রাবণের এক বর্ষাস্নাত দুপুর।
আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, বৃষ্টির শব্দে থমথমে হয়ে আছে চারদিক।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এক পুরনো গ্রাম—নয়াবাড়ি।
এই গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় জায়গার নাম “সর্দার বাড়ি”।

পুরো গ্রামজুড়ে কানাঘুষা চলে,
“ওই বাড়ির ভিতর সন্ধ্যার পরে আলো জ্বলে!”
“রাতে কেউ গেলেই আর ফেরে না!”
“সেই জমিদার রঘুনাথ সর্দারের পরিবার ভয়ঙ্করভাবে খুন হয়েছিল!”

কিন্তু এসব কথায় এখন আর নতুন প্রজন্ম বিশেষ কান দেয় না।
বিশেষ করে শহর থেকে গ্রামে আসা রঞ্জন, যার দাদু ছিলেন জমিদার সর্দারের ভাইপো।
সদ্য ঢাকা থেকে পোস্টিং পেয়ে এসেছেন পটিয়া থানার শিক্ষক হিসেবে।
সঙ্গে এসেছে তার স্ত্রী মধুরিমা ও দশ বছরের ছেলে অনিক।
তারা থাকার জন্য বেছে নিয়েছে সেই পুরনো “সর্দার বাড়ি”টিকেই।



প্রথম দিনের সকাল ছিল একেবারে শান্ত।
বাড়ির চারপাশে লতাগুল্ম, ধুলো জমে থাকা জানালা, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া দেয়াল—সব মিলিয়ে কেমন যেন একটি নিঃসঙ্গ অতীত লুকিয়ে আছে সেখানে।
মধুরিমা অবশ্য প্রথম দিনেই বলেছিল,
“এখানে থাকা যাবে না রঞ্জন, আমার বুক কেমন কেঁপে ওঠে।”

রঞ্জন হেসেছিল,
“ভয় পাস না, এগুলো সব লোকের বানানো গল্প। পুরনো বাড়ি, তাই শব্দ একটু বেশি হয়। কিন্তু ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।”

অনিক তো খুশিতে ডানাদাওয়ালা। বড় মাঠ, খালি ঘর, একেকটা ঘর যেন একেকটা অভিযান।
কিন্তু প্রথম রাতেই ঘটল অদ্ভুত কিছু।



রাত তখন দুইটা।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে জোরে, বিদ্যুৎ চলে গেছে, ঘরের বাতাস ভারী।
মধুরিমা ঘুম থেকে উঠে দেখে, অনিক নেই পাশে!
ছেলের নাম ধরে ডাকে, উত্তর নেই।

রঞ্জন লণ্ঠন নিয়ে উঠে পড়ে। সারা বাড়ি খুঁজেও অনিকের কোনো নামগন্ধ নেই।

শেষে পুরনো দালানের ধারে একটা ঘরে হালকা আলো দেখা যায়।
রঞ্জন ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

ঘরের দরজা খোলা।

ভেতরে অনিক দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ঠায়, চোখ দুটো স্থির। সামনে একটা ভাঙা আয়না, আর আয়নার ভেতর যেন একটা অন্য অনিক! তার ঠোঁট নড়ছে না, অথচ গলা শোনা যাচ্ছে—
“এই বাড়ির রক্তে ভিজে আছে আমার মৃত্যু।
তোমাদের কেউ বাঁচবে না।”

মধুরিমা ছেলের হাত ধরে টান দেয়, চিৎকার করে ওঠে।
রঞ্জন লণ্ঠনের আলো আয়নার দিকে ফেলতেই মুহূর্তেই নিভে যায় আলো।
একসঙ্গে কেঁপে ওঠে মেঝে।
তিনজনই দৌড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে।

সেই রাত থেকে শুরু হল এক অদ্ভুত অধ্যায়।



প্রতিদিন ঘরের কোথাও না কোথাও পায়ের শব্দ, কার যেন হাসি, ছাদের উপর হঠাৎ পদচারণা।
রাত্রি হলেই বাচ্চার কান্নার আওয়াজ।
ঘড়ির কাঁটা বারোটায় এলেই বাড়ির বাতাস হয়ে যায় ঠান্ডা জমাট, এমনকি গ্রীষ্মকালেও।

মধুরিমা রোজ স্বপ্ন দেখে একজন শাড়ি পরা বউ—গলায় কাঁচের মালা, কপালে সিঁদুর, কিন্তু চোখে আগুন।
সে চিৎকার করে বলে—
“আমার সন্তানকে পুঁতে রেখেছিল ওরা মেঝের নিচে। আমি ক্ষমা করিনি কাউকে!”

রঞ্জন তখন কিছুটা বিশ্বাস করতে শুরু করে—এটা শুধু কাকতালীয় নয়।
সে গ্রামের পুরনো পুরোহিত বিষ্ণুপদ মিশ্রর কাছে যায়।
তিনি কেঁপে উঠে বলেন,
“তুমি সর্দার বাড়িতে উঠেছো! জানো না, সেই বাড়িতে কী ঘটেছিল?”



১৮৭৩ সালে, রঘুনাথ সর্দার ছিলেন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার।
তার স্ত্রী ছিল কল্পনা সর্দার—রূপে ও গুণে অনন্যা।
কিন্তু প্রভাব ও সম্পত্তির লোভে তার ছোট ভাই বিপদনাথ সর্দার এক রাতে পুরো পরিবারকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলে।
শেষ রাতে কল্পনা প্রাণপণে তার সদ্যোজাত শিশুকে লুকিয়ে রাখে মাটির নিচে এক সিন্দুকে।

লোককথা বলে, কল্পনার আত্মা আজও খুঁজে বেড়ায় তার সন্তানকে।
বাড়ির ঘরে ঘরে নাকি আজও ছড়িয়ে আছে সেই প্রতিশোধের আগুন।



রঞ্জন ভাবলো,
“আমার ছেলে? সেই আত্মা কি তাকে নিজের সন্তান ভাবছে? যদি সে তাকে নিয়ে যেতে চায়?”

ঘরে এসে মধুরিমাকে সব খুলে বললো।
তারা স্থির করলো, বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
কিন্তু সেদিন রাতে হলো সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা।

রাত একটা।
অনিক আবার নিখোঁজ।
এবার কোনো ঘরে নেই, বাইরে নেই, পুকুরঘাটও খুঁজেছে।
শেষে তারা গিয়েছিল সেই দালানের নিচতলায়—সেই ভাঙা ঘর, যার মেঝে একটু উঁচু।
মেঝের উপর ধুলোয় লেখা:

“ও আমার…
ফিরে দাও ওকে…
মা এসেছিল… তুমি বাধা দিলে কেন?”

মধুরিমা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়।

রঞ্জন মাটির নিচে খুঁড়তে শুরু করে।
একটু পরেই সেখান থেকে মেলে একটি ছোট কাঠের সিন্দুক।
তাতে জড়ানো এক শিশুর কঙ্কাল, সঙ্গে লাল রঙে লেখা এক চিঠি—
“যদি কেউ আমার সন্তানকে ভালোবাসে, তাকেই আমি মা বলে নেব।
আর কেউ যদি আলাদা করতে চায়…
তাহলে সে সর্দার বাড়ি থেকে ফেরে না।”



অনিক পরদিন সকালে নিজে নিজেই ফিরে আসে।
চোখে ঘোর, মুখে হালকা হাসি।
সে বলে,
“এক মা আমাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিল। গান গাইছিল। খুব ভালো লাগছিল, কিন্তু মা বললো তোমরা কাঁদছো, তাই চলে এলাম।”



তারপর?

রঞ্জন পরিবার নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
কিন্তু যাওয়ার সময় এক পুরনো পুকুরপাড়ে তারা শেষবারের মতো দাঁড়ায়।
অনিক পেছনে ফিরে বলে,
“মা বলেছিল আমি বড় হলে ওর সঙ্গে থাকব।
কিন্তু এখন না।
এখন আমার পৃথিবীটা তোমরা।”

মধুরিমা কেঁপে ওঠে।

রঞ্জন সেই সিন্দুকটিকে আবার সযত্নে কবর দেয় বাড়ির উঠোনেই।
তার উপরে লাগিয়ে দেয় বেলি গাছের চারা।
বলে—
“তোমার সন্তান এখন আমাদের সন্তান।
তুমি শান্ত হও, কল্পনা সর্দার।
আমরা আর কোনোদিন তোমার ভালোবাসা থেকে অনিককে আলাদা করবো না।”



সেই গাছটা আজো আছে।
ফুল ফোটে প্রতি শ্রাবণ সন্ধ্যায়।
পাশ দিয়ে গেলে হালকা গন্ধে ভরে যায় চারপাশ।
লোকেরা বলে—
সেই ঘ্রাণ আসলে এক মায়ের স্নেহ।
এক ভয়ঙ্কর আত্মাও, ভালোবাসার ছোঁয়ায় শান্ত হতে পারে।
40 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: