ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুজলের মতো ফোঁটা ফোঁটা জল। ঢাকা শহরের গলির মধ্যে এক পুরোনো, ধূসর বাড়ি। তিনতলার শেষ কোণার ঘরটায় বসে আছে এক মেয়ে—জাহানারা। বয়স চব্বিশ। চুলগুলো এলোমেলো। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তাতে একরকম গোপন সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। মুখে নেই প্রসাধনীর ছোঁয়া, তবু যেন এক বিষণ্ন রূপ জড়িয়ে আছে তার চারপাশে।
জাহানারা একা থাকে না। থাকে তার মা। তবে মা অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না। বাবা গত হয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। তখন জাহানারা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। বাবার মৃত্যু আর মায়ের অসুস্থতা মিলে তার জীবন থমকে গিয়েছিল। পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হয়। বন্ধুরা একে একে দূরে সরে যায়। সম্পর্কগুলো হঠাৎ করে ঠান্ডা পড়ে।
তবে একসময় সে স্বপ্ন দেখত। বড় হয়ে শিক্ষক হবে। গরীব ছেলেমেয়েদের পড়াবে। কবিতা লিখবে। আর একটা জীবন গড়ে তুলবে—যেখানে ভালোবাসা থাকবে, সাহস থাকবে, সম্মান থাকবে।
কিন্তু স্বপ্ন তো হাওয়ার মতো। চোখে ধরা যায়, হাতে ধরা যায় না।
তিন বছর হলো, জাহানারা একাই সামলাচ্ছে সংসার। টিউশন করে। গলির মাথার এক দর্জির দোকানে বসে ডিজাইন করে শাড়ির কাজ। মাস গেলে পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় যা হোক চলে যায়।
তবু রাতে ঘুম আসে না ঠিকঠাক। বুকের ভেতর একটা শূন্যতা—যা হয়তো অনেক দিনের চাপা কান্নার নাম।
একদিন বৃষ্টির মধ্যেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ল কেউ।
"কে?"—জাহানারা জিজ্ঞেস করল।
"আমি… রায়হান।"
নামটা শোনামাত্রই হঠাৎ হৃৎপিণ্ড থেমে গেল কিছুক্ষণ।
রায়হান?
সে তো… তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ভালোবাসা। চার বছর আগে, জাহানারা যখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, রায়হান তখন ফাইনাল ইয়ার। বইয়ের পাতা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পরিচয় হয়। তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আড্ডা, কবিতা শোনানো… আর একদিন হঠাৎ প্রেম।
রায়হান বলেছিল—"তুমি একদম অন্যরকম, জানো? তোমার চোখে যে দুঃখ লুকিয়ে থাকে, তাতেই আমি ডুবে যাই।"
কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর, সব কিছু থেকে কেমন যেন সরে গেল রায়হান। কোনো এক সকালে, কেবল একটা ছোটো মেসেজ—
"আমার এক চাকরির সুযোগ এসেছে কানাডায়। যাওয়া দরকার। তুমি খুব ভালো থাকো।"
তারপর নিঃশব্দ বিদায়।
জাহানারা সেইদিন কেঁদেছিল। বুক ফেটে গিয়েছিল। কিন্তু কাউকে বলতে পারেনি কিছু।
আর আজ এত বছর পর, সেই রায়হান তার দরজার সামনে?
সে ধীরে ধীরে দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে এক ছাতা হাতে চশমা পরা রায়হান। একটু বুড়ো হয়েছে বটে, কিন্তু চোখ দুটো আগের মতোই গভীর।
"তুমি... কেমন আছো?" —রায়হান জিজ্ঞেস করল।
জাহানারা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে তাকিয়ে রইল।
"আমি জানি, হঠাৎ করে এসে পড়াটা ঠিক হয়নি। কিন্তু… আমি খুব অনুতপ্ত। জানো? সেইদিনের মতো ভুল আর করিনি জীবনে।"
জাহানারার ঠোঁট কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে এলো।
"তুমি কেন এসেছো?" —নরম গলায় প্রশ্ন করল সে।
"জানার জন্য… তুমি এখনো আমাকে ঘৃণা করো কিনা।"
একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো। বৃষ্টির আওয়াজ যেন আরও গভীর হলো।
"ঘৃণা করিনি," —জাহানারা বলল অবশেষে। "ঘৃণা করলে এতটা ভালোবাসতে পারতাম না এত বছর।"
রায়হান চমকে তাকাল। চোখে পানি।
"তুমি এখনো একা?" —সে জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ। মা আছেন। আর আমি… আমি জাহানারা। যার জীবনে এখনো কোনো ‘রানার’ আসেনি।"
রায়হান একটু হাসল। পুরোনো সেই হাসি।
"তাহলে এবার আসি?" —সে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।
জাহানারা চুপ করে তাকিয়ে রইল তার চোখে। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। সূর্যের আলো জানালার কাঁচে ভাঙছে।
সময় থেমে আছে—এক মুহূর্তের জন্য।
তবে হয়তো এবার জাহানারার জীবনে সত্যিই একটা নতুন সকাল আসছে।
জাহানারা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
980
Views
5
Likes
0
Comments
0.0
Rating