সাতারা জেলার পাহাড়ি গ্রাম "পচগানি"।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট গ্রামে দিনের শুরু হয় ভোরবেলার ঘণ্টাধ্বনিতে, আর শেষ হয় হাটের নরম আলোতে।
এই গ্রামের এক সাধারণ চাষি পরিবারে জন্ম স্নেহা জাধব।
স্নেহা হাইস্কুলে পড়ে—সবে ক্লাস ইলেভেন। বাবার নাম বিজয় জাধব, মা নাম রেখেছিলেন এক মারাঠি দেবীর নামে—তুলজা।
তাদের সংসার ছিল গরু, খেত, আর গ্রামের ছোট্ট লাইব্রেরির পুরনো বই নিয়ে।
কিন্তু গল্পের শুরু এখানেই নয়।
গল্পের শুরু স্নেহার সঙ্গে আরিফ শেখ নামের ছেলেটির পরিচয়ে।
---
আরিফ ছিল পাশের গ্রামের ছেলে। তার বাবা সাইকেল মেরামতের দোকান চালাতেন।
আরিফ পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার সত্যিকারের আগ্রহ ছিল চিত্রাঙ্কনে।
সে মাঝে মাঝে পেইন্টিং করতে করতে স্নেহার লাইব্রেরিতে এসে বই পড়ত।
স্নেহা প্রথমে বিরক্ত হত, কারণ আরিফ পেছনের টেবিলে বসে তার দিকে তাকিয়ে থাকত।
কিন্তু একদিন স্নেহা ভুল করে তার বইয়ের মাঝে রেখে এসেছিল এক খোলা চিঠি—যেখানে সে লিখেছিল:
“মা বলে, ভালোবাসা পাপ। কিন্তু আমি জানি, কারো জন্য মন কাঁদলে সেটা নিশ্চয়ই পূর্ণ পুণ্য।”
আরিফ সেটা পড়েনি, কিন্তু তার ওপর আঁকা ছিল স্নেহার ছবি—ছায়া আঁকা, চোখের ওপর কালি লেপা, যেন রাত্রি জমে আছে।
---
ধীরে ধীরে, বই আর পেইন্টিংয়ের ছুতোয় কথা শুরু হলো।
স্নেহা বুঝতে পারছিল, সে বদলে যাচ্ছে। তার মন বইয়ের পাতার বাইরে তাকাতে শিখছে।
আরিফ একদিন সরাসরি বলল,
– "তুমি জানো, আমি শহরে যেতে চাই, আর্ট কলেজে ভর্তি হতে। কিন্তু যাওয়ার আগে যদি কিছু রেখে যেতে পারি, সেটা হবে তোমার মুখ।"
স্নেহা হেসে বলল,
– "আমার মুখে কি আছে? আমি তো কৃষকের মেয়ে।"
আরিফ বলল,
– "তোমার মুখে আছে অপেক্ষা—যেটা শহরের কোন মেয়ের মুখে নেই।"
---
কিন্তু সব সম্পর্কেই বাধা থাকে।
আর এই গ্রামে ধর্মের দেয়াল ছিল পাথরের মত।
একদিন স্নেহার মা তাদের কথা জেনে যান।
গ্রামের মাতব্বর এসে হুমকি দেন:
– “জাধব ঘরের মেয়ে মুসলমান ছেলের সঙ্গে প্রেম করবে? এটা চলবে না! যদি আবার ছেলেটিকে এখানে দেখি, ওর পা ভেঙে দেব!”
স্নেহা চোখে পানি এনে বলে,
– "আমি কিছু করিনি মা, কিচ্ছু না... ও শুধু আমার জন্য একটা পেইন্টিং এঁকেছে।"
কিন্তু মায়ের চোখে ছিল আতঙ্ক, সমাজের ভয়, এক মেয়েকে ‘ঠিক পথে রাখার’ বদ্ধ অভিপ্রায়।
---
এরপর একরকম জোর করে স্নেহার বিয়ের কথা পাকাপাকি করা হয় পাশের এক মারাঠা পরিবারের ছেলের সঙ্গে।
আরিফকে বলা হয়েছিল গ্রাম ছাড়তে।
আরিফ কোনো অভিযোগ করেনি।
শুধু যাওয়ার আগে লাইব্রেরির সেই জানালার নিচে একটা খাম রেখে যায়।
স্নেহা অনেকদিন পর খামটা পায়।
তখন বিয়ে ঠিক, কিন্তু মন অস্থির।
খাম খুলে দেখে, এক চিঠি আর একটা পেইন্টিং।
চিঠিতে লেখা—
“তোমার চোখের মাঝে আমি আমার ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম।
তোমার গ্রামের পাথরও বুঝে গিয়েছিল আমি তোমায় ভালোবাসি।
কিন্তু তুমি যদি কখনো আমাকে ফিরে পেতে চাও, আমি শহরের এক নম্বর বাসে প্রতিদিন বিকেল ৫টায় উঠে পড়ব।
একদিন তুমি যদি একবার বলো, ‘চলো’, আমি সমস্ত ধর্ম, পাথর আর সমাজ পেছনে ফেলে চলে যাব।”
আর পেইন্টিংয়ে আঁকা—
একটা বাস স্টপেজে দাঁড়ানো একটা মেয়ে, যার চোখের সামনে ঝুলে আছে হলুদ ওড়না।
---
স্নেহা আজও জানে না, কেন সে চিঠির জবাব দিল না।
সম্ভবত, ভয়।
সম্ভবত, সমাজের চাপ।
কিন্তু বিয়ের দিন সকালে সে আচমকা হাটের পথ ধরে বেরিয়ে যায়।
বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে সে পৌঁছে যায় শহরের এক নম্বর বাস স্টপে।
বাস চলে আসে।
কিন্তু আরিফ আর উঠে না।
স্নেহা দাঁড়িয়ে থাকে, চোখের সামনে ঝুলে পড়ে সেই হলুদ ওড়নাটা।
কেউ একজন বলে ওঠে—
– “বহু বছর আগেও একজন এখানে এসেছিল কারো জন্য। কেউ আসেনি। এখন আর কেউ আসে না।”
স্নেহা পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে।
শেষ পত্রের আগে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
76
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating