বৌমা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বিকেলের রোদটা জানালার ফাঁক গলে নরম করে ঘরে ঢুকছে। চা খেতে খেতে বৃদ্ধা সাবেরা খাতুন চুপচাপ বসে আছেন বারান্দার এক কোণে। তাঁর মুখে গভীর প্রশান্তি, কিন্তু চোখে একধরনের অস্পষ্ট অপেক্ষা। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি অপেক্ষা করছেন— সেই মেয়েটার জন্য, যাকে তিনি মেয়ে বলেন না, বলেন ‘বৌমা’।

তাঁর ছেলেটা, রিয়াজ, আজ পাঁচ বছর হলো নেই। হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যায়। যেদিন ফোন এসেছিল, "আপনার ছেলের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে," সেদিনই যেন তাঁর পৃথিবীটা থেমে গিয়েছিল। অথচ সেই দুঃসময়ে, যারা সবাই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই সময় একটিবারের জন্যও সাবেরার হাত ছাড়েনি যে, সে হলো মেয়ে না হয়ে উঠতে পারা একটা মেয়েই — তার ছেলের বউ, নীরা।

নীরা, মাঝবয়সী একটি মেয়ে, চোখে যেন একটা নীরব জেদ। রিয়াজ মারা যাওয়ার পর অনেকেই বলেছিল— “নীরা আবার বিয়ে করুক। মেয়েটার তো জীবন পড়ে আছে।” কিন্তু সে শুধু বলেছিল, “আমি এই ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না। সাবেরা আম্মুই আমার এখন পৃথিবী।”

প্রতিদিন সকালে নীরা ঘুম থেকে উঠে সাবেরার ওষুধ দেয়, রান্না করে, ঝাড়ু দেয়, আবার স্কুলে যায়— সে এখন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। ফিরে এসে আবার সাবেরার পাশে বসে। মাঝেমধ্যে গল্প করে, মাঝে মাঝে গালমন্দও শুনে। কিন্তু কোনো অভিমান নেই, কোনো ক্লান্তি নেই।

গ্রামে কেউ কেউ বলে, “নীরা তো ছেলের মরা বউ, আর কী করবে?” কিন্তু এই ‘ছেলের মরা বউ’ই যেন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত আশ্রয়— এক আশ্চর্য বেঁচে থাকা।

আজকেও নীরা ফিরল স্কুল থেকে। জামা পাল্টে এসে বারান্দায় বসে পড়ল সাবেরার পায়ের পাশে।
— “চা করবো আম্মু?”
সাবেরা খাতুন মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ রে, একটু আদা দিস… বুকটা ব্যথা করছে।”

নীরা উঠে গেল। চা করতে করতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রোদটা গায়ে মেখে ভাবল, "আশ্চর্য, একটা মানুষকে মায়ের মতো ভালোবাসতে কতটুকু লাগে? শুধু রক্তের সম্পর্ক লাগে না, লাগে একটা মন— যেখানে যত্ন থাকে, নিঃস্বার্থতা থাকে।"

রাতে খাওয়া শেষে, সাবেরা বললেন,
— “শোন, একটা কথা বলি?”
— “বলো আম্মু।”
— “তুই আবার বিয়ে কর।”

নীরার মুখ থমকে গেল। সেই পুরনো কথা।
— “আম্মু, আমি তো ভালো আছি।”
— “ভালো আছিস, জানি। কিন্তু আমি তো যাবই একদিন। তারপর...?”
— “তুমি গেলে আমি আর থাকবো না কেন, আম্মু? আমি তো তোমার মেয়ে, তুমি আমার মা। রিয়াজ ছিলো আমার স্বামী, ঠিক আছে। কিন্তু তুমি আমার হৃদয়ের স্থায়ী ঠিকানা।”

সাবেরা খাতুন চোখ মুছলেন। এক ফোঁটা কান্না গড়িয়ে পড়লো, কিন্তু সেই কান্না ছিল না দুঃখের— ছিল আত্মতৃপ্তির।

পরদিন সকালে পাড়ার মেম্বার সাবেরার কাছে এলেন। বললেন, “আপার, একটা ভালো ছেলে আছে, বিধবা হলেও ভালো ঘরের। আপনি বললে নীরার সাথে কন কথা বলি।”

সাবেরা একটু চুপ করে থেকে বললেন,
— “না ভাই, আমার বৌমা এখনো এই ঘরের বাতাসে রিয়াজের গন্ধ পায়। ওর জীবন আমার ছেলের স্মৃতিতে বাঁধা। নতুন সংসার গড়ার কথা ও ভাবতেই পারে না।”

মেম্বার চলে গেলেন। নীরা জানাল না কিছু, কিন্তু রাতে সাবেরার কোল ঘেঁষে বসে বলল,
— “আমি জানি তুমি কষ্ট পাও আমার জন্য। কিন্তু আম্মু, বিশ্বাস করো— আমি তোমার মেয়ে হয়েই থাকতে চাই। আমাকে আর কোথাও পাঠিও না।”

সেই রাতে প্রথমবার, সাবেরা খাতুন নীরার কাঁধে মাথা রাখলেন। এই বৃদ্ধা, যার জীবন থেকে স্বামী গেছে, ছেলে গেছে— তার মেয়েও তো নেই রক্তের, কিন্তু সেই না-মেয়ে মেয়েটার বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আকাশে তারার আলো।
আর একটা ঘরে— দুই নারীর মধ্যে একটা মায়ার সম্পর্ক…
যা রক্তের নয়, কিন্তু মনের—
সেই সম্পর্কের নাম — “বৌমা”।
51 Views
6 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: