গ্রামের সবচেয়ে পুরনো স্থান, শীতলপাতার ভেতর গোপন এক মন্দির। বারান্দার ছাদ ধ্বংসপ্রায়, দেয়াল ছেঁড়া, মাটিতে ছড়ানো মধুরচন্দ্র পত্র। অনেকের বিশ্বাস এই মন্দিরে কিছু আছে — কোনো এক কালো অতীতের ছায়া, যা দিনদুপুরেও মানুষের ভয়কে ছড়িয়ে দেয়।
এই গ্রামের নাম পাটিমাড়ি, যেখানে বহু বছর আগে একটি নিষ্পাপ পরিবার বাস করত — হোসেন পরিবার। পরিবারটির সকল সদস্য এককালে রহস্যজনক ভাবে বিলুপ্ত। কেউ জানে না কি হলো তাদের সাথে, কেউ জানতে চায়নি।
একদিন এই গ্রামের ছোট্ট মিঠু নামের ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। সে শহরের জীবনের ক্লান্তি ভুলতে এই মন্দিরের রহস্য জানার জন্য একাকী সেই মন্দিরে ঢুকে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল।
তার মনে ভীষণ কৌতূহল আর ভয়। রাতের প্রথম অন্ধকার যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, সে মন্দিরের কাঁচা মাটির পথ ধরে ঢুকল। বাতাসে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ, মনে হচ্ছিল অজানা কেউ তার পিছু নাড়ছে। তার হৃদয় ধুকধুক করছিল তীব্রতায়, যেন কেউ মাথার ঠিক ওপর থেকে নিশ্বাস ফেলছে।
মন্দিরের ভেতরে ঢুকেই একটা ঠাণ্ডা ঝড় লেগে গেলো। বাতাস যেন একবারে ঘন কালো হয়ে গেলো। মিঠু হোঁচট খেয়ে পড়ল। সে উঠে দাঁড়াল, চারপাশে চোখ বোলাল।
"কেউ আছে?" সে গলায় কম শব্দে বলল।
কিন্তু উত্তর ছিল নিস্তব্ধতা।
পা বাড়িয়ে সে মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণে গেল। সেখানে একটা পুরনো, রক্তিম ছায়ার মতো আকার ঝলমল করছিল। ছায়াটা যেন জীবন্ত। সে আস্তে আস্তে ছায়ার দিকে এগোতে থাকল। এক মুহূর্তে ছায়াটি তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি কে?” মিঠু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
ছায়াটা ফিসফিস করে বলল,
“আমি সেই বেদনার রক্তিম ছায়া, যাকে ভুলে যাওয়া যায় না। আমি সেই আত্মা, যা এই মন্দিরের মাটিতে রক্ত দিয়ে আবদ্ধ। আমি ফিরে এসেছি, প্রতিশোধ নিতে।”
মিঠুর হৃদয় থমকে গেল। সে মাটিতে পড়া এক রক্তিম পাথরের দিকে তাকাল। পাথর থেকে ধোঁয়া বের হয়ে আসছে, ঘন কালো, গা ছমছমে করে দেওয়া।
হঠাৎ মিঠুর পিছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সে ঘোরাফেরা করতে লাগল কিন্তু আর বের হওয়ার রাস্তা পেল না। বাতাসে শিস শিস করে শব্দ উঠল, যেন হাজারো কণ্ঠস্বর একসাথে কাঁদছে, চিৎকার করছে।
“আমাকে ছেড়ে যেও না…” ধোঁয়া আর ছায়ার গলা শোনা গেল।
মিঠু কেঁপে উঠল, শীতল ঘাম পড়ল পিঠ বরাবর। সে চিৎকার করল, কিন্তু তার শব্দ নীরব হয়ে গেল যেন।
ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেলো, ছায়াগুলো ঘিরে ধরল তাকে। গায়ের লোমগুলো এক একটি করে সোজা হয়ে উঠল, তার শরীর থমকে গেলো এক অদ্ভুত জায়গায়।
“তুমি পালাতে পারবে না,” শিস্ শিস্ আওয়াজগুলো বলল। “আমাদের ব্যথা ভুলবে না কেউ।”
মিঠু বুঝতে পারল এটা শুধু কোনো ভূত নয়— এটা সেই আত্মা, যা এক সময়ে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল। সে সেই পরিবার, যা নিষ্পেষিত হয়েছিল এক আততায়ীর হাতে, আর তাদের মৃত্যু আজো বিচার পায়নি।
মিঠু চেয়েছিল পালাতে, কিন্তু সে আটকা পড়ল এই রক্তিম ছায়ার জালে। সে তখন বুঝল, এই মন্দিরের ঘরে ঘরে এখনও জ্বলছে সেই আগুন, যা নিভে যায়নি শত বছরেও।
রাত্রি গভীর হলো, বাতাস থেমে গেল, আর মিঠুর চিৎকার এক লম্বা বিষাদের সুরে মিশে গেল…
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা মন্দিরের দরজা খুলতে গেল, কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেল না। কেবলমাত্র মাটি থেকে গা ছমছমে ঠান্ডা বাতাস বের হচ্ছিল।
সেই থেকে গ্রামের সবাই বিশ্বাস করে—
রক্তিম ছায়া এখনও ছায়াময় এই মন্দিরে ঘুরে বেড়ায়, আর যাকে দেখে, তার গায়ের লোম অটুট হয়ে যায়, আর সে ভূতের আতঙ্কে কাঁপে দেহভর।
রক্তিম ছায়া
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
45
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating