আমার অতীত

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
আমি জানি, তুমি আমাকে কখনোই সেভাবে বুঝবে না। কারণ আমি নিজেও নিজেকে অনেক সময় বুঝে উঠতে পারিনি। তবে আজ যখন রাত গভীর হয়ে এসেছে, বাতাসে যেন বিষের ঘ্রাণ, আমি ঠিক করেছি— আমার অতীতটা একবার বলে যাই।

এই যে আমি— এখনকার হাসিখুশি, পড়ালেখায় ভালো, একটু গম্ভীর প্রকৃতির ছেলেটা— আমি কিন্তু এমন ছিলাম না। আমার অতীত ছিল একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন, একটা অন্ধকার গুহা, যেটার দেয়ালে শুধু আর্তনাদের প্রতিধ্বনি।

ছেলেবেলা কেটেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে, একটা ছোট পল্লীতে। বাবাকে কোনোদিন দেখিনি। মা ছিলেন একজন গার্মেন্টস কর্মী। প্রতিদিন সকাল আটটায় বের হতেন, ফিরতেন রাতে। আমি বাড়িতে একাই থাকতাম। পাঁচ বছর বয়সেই শিখে গিয়েছিলাম কীভাবে গ্যাস চালিয়ে ভাত বসাতে হয়।

আমাদের বাড়ির একপাশে থাকত মোজাম্মেল চাচা— এলাকার সবচেয়ে ধনী মানুষ, সবাই তাকে খুব শ্রদ্ধা করত। তিনি আমার মায়ের ওপর ‘দয়া’ করতেন। মাঝে মাঝে টাকা দিতেন, চাল-ডাল এনে দিতেন। মা বলতেন,
“ওনার মতো মানুষ আজকাল আর নাই, দোয়া করিস এমন মানুষ যেন তোর জীবনেও আসে।”

আমি ছোট ছিলাম। বুঝিনি, ওই দয়া কীভাবে ধীরে ধীরে একটা ফাঁদে পরিণত হচ্ছিল।

একদিন বিকেলে, মা তখন নাই, মোজাম্মেল চাচা আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন তাদের বাড়ির পিছনের গোডাউনে। বললেন,
“আয়, তোকে নতুন একটা খেলনা গাড়ি দেখাই।”

আমি শিশু, খুশি হয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিনের সেই বিকেলেই আমার শৈশব শেষ হয়ে গিয়েছিল।

সেদিন থেকে শুরু হলো নির্যাতন। মাঝে মাঝে রাতেও ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, “কাউকে বলবি না, বললে তোকে মেরে ফেলব।”
আমি বলতাম না। শুধু নিজের শরীরটাকে আয়নায় দেখে ভয়ে কেঁপে উঠতাম। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আতঙ্কে জেগে উঠতাম— মনে হতো দরজা খুলে সেই লোকটা আবার এসেছে।

আমি ধীরে ধীরে গুমরে যেতে থাকলাম। স্কুলে কথা বলতাম না, খেলাধুলা করতাম না। ক্লাসের ফাঁকে গিয়ে টয়লেটে কাঁদতাম। একদিন মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“তোর চোখে এমন লাল কেন, ছেলেটা? রাতে ঘুমাস না?”

আমি হেসে বলেছিলাম,
“দুঃস্বপ্ন দেখি।”

দুঃস্বপ্ন তো ছিলই, কিন্তু সেটা রাতের ঘুমের না— আমার জেগে থাকার দুঃস্বপ্ন।

একদিন সাহস করে মাকে বলেছিলাম— “মা, মোজাম্মেল চাচা খারাপ।”
মা থমকে গিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎই একটা চড় কষালেন।
“চুপ কর! যারা আমাদের উপকার করে, তাদের নামে মুখ খোলার সাহস হয় তো তোদের? এমন বাজে কথা আর শুনি তো জিভটা কেটে দেব!”

সেদিন বুঝলাম, আমি একা। একেবারে একা।

এরপর তিন বছর কেটে গেছে। আমি বড় হয়েছি, শরীরে ক্ষত কমেছে, কিন্তু ভেতরে সেই পোড়া দাগটা এখনো পুড়ে যায় মাঝরাতে। আমি ঘুমের মধ্যে এখনো চিৎকার করি। মা এখনো জানে না কেন আমি একা ঘুমাই না, কেন ঘুমানোর আগে জানালার ছিটকিনি বারবার দেখে নিই।

একদিন মোজাম্মেল চাচা স্ট্রোক করলেন। প্যারালাইসড হয়ে পড়ে গেলেন। পুরো শরীর অসাড়। শুধু চোখটা কাঁদে।

আমি তখন কলেজে উঠেছি। ক্লাস শেষে একদিন গিয়েছিলাম তার ঘরে। অনেক লোক সেখানে ভিড় করেছে, কিন্তু আমি তার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম একা। আমি বললাম,
“আমার নাম মনে আছে তো? ছোটবেলার সেই ছেলে…?”

তিনি চোখ মেলে তাকালেন। আমি দেখলাম, সেই চোখে এখন আর হিংসা নেই, আছে একরাশ ভয়। আমি মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম,
“ভয় পেও না। আমি তোদের মতো না।”

তারপর আমি ফিরে এসেছিলাম।


---

আজ এত বছর পরও, কেউ আমার অতীত জানে না। জানলেও বুঝবে না।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে, আমি চোখ বন্ধ করে সেই ঘরটা দেখতে পাই— সেই ছেলেটাকে দেখতে পাই, যে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কোণে, কাঁপতে থাকে। আর আমি জানি, সে আমি। আমি নিজেই নিজের অতীত।

মানুষ ভাবে, সময় সব ক্ষত মুছে দেয়। ভুল ভাবে।

সময় শুধু ক্ষতটাকে গভীরে ঢুকিয়ে রাখে। যেন কেউ দেখতে না পায়। কিন্তু সেটা মাঝে মাঝে ভেতর থেকে রক্ত ঝরায়, কাঁদে, আর মনে করিয়ে দেয়—

“তোর অতীত তোকে আজও ছেড়ে যায়নি।”

আমি এখন পড়াশোনা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভালো বন্ধু আছে, কেউ কেউ প্রেমের কথাও বলেছে। কিন্তু আমি কাউকে ছুঁতে পারি না।
কারণ আমার ভিতরে এখনো সেই ভয়ংকর অতীত বসে আছে— ছায়ার মতো, নিঃশব্দ এক আতঙ্ক হয়ে।

তবে আজ আমি লিখলাম। প্রথমবারের মতো লিখে ফেললাম নিজের গল্প।
হয়তো কেউ পড়বে, বুঝবে না।
তবু আমি লিখলাম, কারণ এই শব্দগুলোই আমার মুক্তি।

আমার নাম বলব না, কারণ আমার মতো হাজারটা শিশু আজও একই ছায়ায় বড় হচ্ছে। কেউ দেখছে না, কেউ জানতেও চায় না। কিন্তু ওরা কাঁদে, ভেঙে পড়ে, আবার ভেতরে ভেতরে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়।

আমার অতীত ছিল ভয়ংকর।
তবে আমি এখনো বেঁচে আছি। আর এটাই আমার প্রতিশোধ।
50 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: