মনের মানুষ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পেছনের উঠানে পানের বরজ, কাঁচা রাস্তার পাশে একটা ঝুপড়ি চায়ের দোকান, আর মাঝখানে একটা টিনের ঘর—সেখানেই থাকে রাফি। বয়স তেইশ, সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে স্থানীয় সরকারি কলেজ থেকে। লেখাপড়া শেষে এখন দিন কাটে চাকরির খোঁজে আর দাদার ফার্মেসিতে বসে।

রাফির বাবা নেই, মা অসুস্থ। ভাইবোন বলতে কেউ নেই। ফার্মেসির সামনের বসার চেয়ারে বসে সে প্রতিদিন দেখে একটা মেয়েকে—হালকা গোলাপি ওড়না গায়ে, সাদা সালোয়ার কামিজে, মাথা নিচু করে হাঁটে। রাফির দৃষ্টি বারবার চলে যায় সেই মেয়েটার দিকে। কিন্তু কখনো কথা বলেনি। নাম জানে না, ঠিকানা জানে না, শুধু জানে মেয়েটাকে দেখলে বুকটা ধুকপুক করে ওঠে।

রাফির মা মাঝে মাঝে বলে,
— "তোর বিয়ে দিতে হবে বাবা। ঘরে একটা মেয়েমানুষ দরকার। তুই তো সারাদিন ফার্মেসি, তারপর বই নিয়েই থাকিস।"

রাফি হেসে ফেলে। বলেও না কিছু। কাকে বিয়ে করবে সে? যার মুখ দেখতে পায় শুধু দূর থেকে? তার নামই তো জানে না।

একদিন বিকেলে হঠাৎ ঝড় উঠে। বাজারের দোকানগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। রাফি তাড়াতাড়ি দোকান গুটিয়ে ফার্মেসির টিনে তালা দিচ্ছিল, এমন সময় ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটাকে দেখতে পেল। তার ওড়না উড়ে যাচ্ছে বাতাসে, চুল এলোমেলো, চোখে ভয়। রাফি দৌড়ে গেল তার কাছে।

— "আপু, এইদিকে আসেন। দোকানটার সিঁড়ির নিচে দাঁড়ান। এখান থেকে বাতাস কম লাগবে।"

মেয়েটি একটু দ্বিধায় পড়লেও মাথা নাড়ল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। ঝড় তখন আরও জোরে বইছে। রাফি একপাশে দাঁড়িয়ে রইল, মেয়েটা পাশে এসে দাঁড়ালো।

— "আমি রাফি। ওখানে ফার্মেসি চালাই। আপনাকে প্রায়ই দেখি এখানে দিয়ে যেতে। নামটা জানতে পারি?"
— "সানজিদা।"

একটা নাম... বহুদিনের অপেক্ষার পর এখন তার হৃদয়ে দোলা দেয় সেই শব্দ—সানজিদা।

সেই দিন থেকেই রাফির ভিতর কিছু একটা বদলে যায়। সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সানজিদা কখন রাস্তা দিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে সে দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলে, কখনো সানজিদার হাতে গরম চা ধরিয়ে দেয়, কখনো একগ্লাস পানি।

দিন যায়। কথা বাড়ে। গল্প হয়।

সানজিদা এসএসসি পাস করে আর পড়েনি। বাড়ির অবস্থা ভালো না, বাবা নেই, মা বিছানায়, ভাই অটো চালায়। নিজে সেলাই শেখে। বয়স একুশ। চুপচাপ, শান্ত মেয়ে। চোখে তার দুঃখ জমে থাকে, হাসির পেছনে লুকানো অভিমান।

রাফি আস্তে আস্তে তার কাছে অনুভব করে এক অনির্বচনীয় টান।

— "তোমার কি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?"
— "না। মা অসুস্থ। ভাইও এখনও ছোট। এসব নিয়ে ভাবি না।"

রাফি চুপ থাকে। অনেক কথা বলতে চায়, বলতে পারে না। একদিন বিকেলে সাহস করে বলে ফেলে,
— "তোমার জন্য আমার মন কেমন করে জানো?"

সানজিদা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলে,
— "এই সমাজে এত সহজ না এসব। তুমি গ্র্যাজুয়েট, তুমি শহরে চাকরি করবে একদিন। আমি তো এমন কেউ না।"

— "তুমি আমার মনের মানুষ। আমি অন্য কাউকে চাই না।"

সানজিদা কিছু না বলে সেদিন চলে যায়।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, কিন্তু এরপর আর দেখা হয় না। রাফি পাগলের মতো খুঁজে বেড়ায় তাকে। তার ফার্মেসিতে আসে না, রাস্তায় হাঁটে না, চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যায় না।

একদিন সাহস করে যায় সানজিদাদের বাড়ি। ছোট্ট একটা টিনের ঘর, চারপাশে গাছগাছালি। দরজায় কড়া নাড়তেই বের হয় এক কিশোর—সম্ভবত ভাই।

— "সানজিদা বাড়িতে আছে?"
— "আপনি কে?"
— "আমি ওর বন্ধু, রাফি।"

কিশোর একটু তাকিয়ে বলে,
— "আপা ঢাকায় চলে গেছে। নানাবাড়ি। আর আসবে না। মা মারা গেছেন কয়েকদিন আগে।"

রাফির গলা শুকিয়ে আসে। পায়ের নিচে মাটি সরে যায় যেন।

ফিরে এসে ফার্মেসির জানালার পাশে বসে সে রাত কাটায়। যে সানজিদা ছিল চোখের সামনে, আজ সে নেই। যাকে বলতে চেয়েছিল জীবনের সব কথা, তাকে বলতে পারলো না কিছুই।

তিন মাস পরে, একদিন চিঠি আসে। সাদা খামে, তার নাম লেখা। পাঠানো হয়েছে ঢাকার ঠিকানা থেকে।

> **"রাফি,

তুমি যখন বলেছিলে আমি তোমার মনের মানুষ, তখন বুঝেছিলাম তুমি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করো। কিন্তু আমি তখন প্রস্তুত ছিলাম না। মা চলে গেল, সব এলোমেলো হয়ে গেল।

আজ আমি একটা দর্জির দোকানে কাজ করি ঢাকায়। ভালোই আছি। কিন্তু মাঝে মাঝে তোমার কথা খুব মনে পড়ে। জানো, তুমি ছাড়া আর কেউ কোনোদিন আমাকে এইভাবে গ্রহণ করেনি।

আমি জানি তুমি ভুলে গেছো। হয়ত আর কখনও দেখা হবে না। কিন্তু জানো, আমি যেদিন চলে এসেছিলাম, সেদিনই বুঝেছি, আমারও একটা মনের মানুষ আছে—তুমি।

—সানজিদা"**



রাফির চোখ ছলছল করে ওঠে। সে জানে, এই চিঠিই তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান চিঠি।

তারপর সে সিদ্ধান্ত নেয়। যেভাবেই হোক, সে যাবে ঢাকায়। খুঁজে বের করবে তাকে।

দুদিন পর সে চলে যায় ঢাকায়। সানজিদার চিঠির খামের ঠিকানায়। গলির মধ্যে ছোট্ট দর্জির দোকান। ভেতরে মাথা নিচু করে কাজ করছে সানজিদা। একপাশে ওড়না সেলাই চলছে।

রাফি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
— "সেলাই ঠিক হবে কি না জানি না। তবে মনের ফাটলটা শুধু তুমি সেলাই করতে পারো।"

সানজিদা চমকে তাকায়। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে আসে, রাফির চোখে চোখ রেখে বলে,
— "আমি আজও তোমারই মানুষ, রাফি।"

ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের পেছনে একটা ছোট্ট হলরুমে বিয়ের কাবিন হয়। কেউ দেখে না, কেউ জানে না। কিন্তু দুইটা মন এক হয় চুপিসারে।

এখন আর টিনের ঘর, ফার্মেসি, ঝড়ের দিন নেই—তবে আছে দুটো মন, যাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকে সমস্ত বাস্তবতার মাঝে, সমাজের চোখ এড়িয়ে।

এভাবেই, কোনো শব্দ ছাড়াই, দুজন মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে একে অপরের মনের মানুষ হয়ে।
43 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: