ঝিলসাগরে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সন্ধ্যায় ঝিলের জল নিঃশব্দে কাঁপে। চারপাশে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেন শব্দ করলেই কষ্টটা ভেঙে পড়বে। পেছনে বিস্তৃত ধানখেত, দূরে কুয়াশার মতো ছায়া, মাঝে নীরব একাকিত্বের পাহারা দেয় এক পুরনো পাথরের ঘাট। এখানেই বসে ছিল জুহাইর।

এই ঝিল তার জীবনের মতো—গভীর, শান্ত, কিন্তু ভিতরে অসংখ্য ঢেউ। তার পাশে পড়ে ছিল একটা পুরনো খাতা—যেটা ছুঁলেই কেমন একটা ঘ্রাণ ছড়ায়, ঘ্রাণ নয়, অতীতের ধোঁয়া। খাতার প্রথম পাতায় লেখা—“ঝিলসাগরে, যেখানে তুমি আমাকে হারাওনি, আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছিলাম।”

এই গল্পের শুরু সাত বছর আগে।

গ্রামের নাম ছিল পোড়াগাঁও। সেখানে নতুন পোস্টিং নিয়ে এসেছিলেন একজন মহিলা স্কুল শিক্ষক—রাফিয়া হোসেন। ঢাকায় বড় হওয়া মেয়েটির এই অজ গাঁয়ে আসাটাই ছিল বিস্ময়। মেয়েটির চালচলনে ছিল কিছু অচেনা সাহস, মুখে ছিল শিক্ষিত উচ্চারণ, আর চোখে—অদ্ভুত রকমের দুঃখ। পোড়াগাঁও স্কুলে প্রথম যেদিন এসেছিলেন, তখন রোল নম্বর ২১—জুহাইর, ক্লাস নাইনে।

তাকিয়ে বলেছিল, — “তুমি পেছনে বসে থাকো কেন?”
জুহাইর বলেছিল, — “কারণ, সামনে বসলে চোখে চোখ পড়ে।”

মুখে চওড়া হাসি ফুটেছিল রাফিয়ার।
তবে তা ছিল না রোমান্টিকতা, বরং মায়ার মতো কিছু।

জুহাইর কেবল ক্লাসের ছেলেমেয়ে না, গ্রামের বাকি দুনিয়াও তার গল্প করত। তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল রাতের আঁধারে—মা মরে গেছে শোকে—সে নিজেই বড় হচ্ছে নিজের মতো।
কিন্তু এই ছেলেটা জানত বইয়ের বাইরে কী লেখা থাকে।

রাফিয়া টের পেয়েছিল—জুহাইর যেন জীবনকে পড়তে শিখেছে ব্যাকরণ ছাড়াই।

ধীরে ধীরে সম্পর্কটা বন্ধুত্বে গড়ায়, কিন্তু সমাজ যেটা বুঝে না—সেটা কুৎসা করে।
রাফিয়া একদিন অফিসে ডেকে বলে, — “তুমি খুব চালাক, কিন্তু আমি শিক্ষক... তুমি যদি আমাকে ভুল বুঝো, আমি চলে যাবো।”

জুহাইর কিছু বলেনি।
সে শুধু বলেছিল, — “চোখ দিয়ে যদি শ্রদ্ধা আর প্রেম আলাদা না করতে পারো, তবে মানুষ হইনি।”

রাফিয়া তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।
তারপর বলেছিল,
— “ঝিলসাগর চেনো?”
— “না।”
— “চলো, একদিন নিয়ে যাবো।”

সেই ‘একদিন’ এসেছিল বৈশাখের শুরুর দিনে।
ঝিলের পানি ছিল টলটলে, আকাশ ছিল নীলের পিছে লুকানো কুয়াশা।
তারা দুজন বসেছিল পাথরের ঘাটে।
রাফিয়া বলেছিল, — “যদি কখনো আমি থাকি না, তুমি এই ঝিলটা খুঁজে নিও। এখানে আমার একটা অংশ থেকে যাবে।”
— “আপনার কী চলে যাওয়ার শখ?”
— “না, বাস্তবতা থাকে না চিরকাল। শিক্ষকেরা আসেন, পড়ান, চলে যান। হৃদয়ের কথাগুলো খাতার বাইরে রেখে যান।”

এরপর হঠাৎই বদলি হয়ে যায় রাফিয়া।
কারণ?
গ্রামের লোকেরা বলে—"শিক্ষিকার নজর ছাত্রের উপর পড়েছে।"
আর শিক্ষিকারাও মানুষ—সমাজ তাদের চোখে বাঁশি বাজায় না, বরং বিদ্রুপের বিষ ছোড়ে।

রাফিয়া চলে যাওয়ার আগে স্কুলের লাইব্রেরিতে একটা বই রেখে গিয়েছিল—"দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি"।
বইয়ের ভেতর একটা চিঠি।

> “তুমি যদি একদিন বড় হয়ে যাও, আমাকে যদি আর না মনে রাখো, সমস্যা নেই।
কিন্তু যদি কখনো মনে হয় যে পৃথিবীতে একজন ছিল, যে তোমাকে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছিল,
তবে এই বইটা খুলে পড়বে। আমি জানতাম তুমি একদিন সমুদ্র পাড়ি দেবে,
কিন্তু আমি তো কেবল ঝিলের ঢেউ।”



সাত বছর পর, জুহাইর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক।
ঢাকায় পড়ে, পড়ায়, আর রাতে লিখে।
কিন্তু এখনো সে ঝিলসাগরের পাশের সেই পুরনো পাথরের ঘাটে বসে।

কারণ?

একদিন সে খবর পেয়েছিল—রাফিয়া আত্মহত্যা করেছে।
কারণ বলা হয়েছিল—বিয়েতে জোর, চাকরিতে চাপে, আর ভালোবাসায় অপমান।

কিন্তু জুহাইর জানে, মৃত্যুর আসল কারণ এসবের কিছুই না—কারণ সে জানত রাফিয়া বাঁচতে চেয়েছিল।
সে মরেছে সমাজের কুৎসায়, তর্জনায়, অন্যের চোখে অমান্য হওয়ায়।

আজ ঝিলসাগরে এসে সে লিখে, “যার ভালোবাসা কখনো প্রেমে রূপ নেয়নি, সেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল।”

পেছনে গাছের ছায়ায় হঠাৎ একটা মেয়ের কণ্ঠ শোনা যায়—
— “স্যার, আপনি কি একা এসেছেন?”
জুহাইর ঘুরে দেখে—ছোট্ট এক ছাত্রী।
মেয়েটি হাতে বই, মুখে জিজ্ঞাসুতা।

— “তুমি কে?”
— “আমি ফারজানা। ক্লাস সেভেন। আপনি তো আমার মায়ের নামই বলেছিলেন বারবার—রাফিয়া হোসেন।
আমি জানি আপনি আমার মায়ের প্রিয় ছাত্র ছিলেন।”

জুহাইরের চোখ বিস্ময়ে ছেয়ে যায়।
সে বলে না কিছুই, শুধু হাতে ধরা খাতাটা ফারজানার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

মেয়েটি বলে— — “মা বলেছিল, ‘যদি কখনো ঝিলসাগরে যাও, খুঁজে নিও তাকে—সে হয়তো অপেক্ষা করে।’”

জুহাইরের চোখে জল এসে যায়, কিন্তু সে হাসে।
কারণ এক অসমাপ্ত প্রেম, আজ আরেক প্রজন্মে গিয়ে একটু হলেও পূর্ণতা পেয়েছে।

আর ঝিলসাগরের জলে পড়ে সূর্যের রঙ।
এই জল শুধু জল না—এটা ভালোবাসার প্রমাণ, যা কখনো ফুরায় না, শুধু রয়ে যায়...
একটা নামহীন বাঁশির মতো।
43 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: