ভালোবাসা কি অপরাধ?

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গভীর রাতে ঢাকার গলিগুলো যেমন নীরব হয়, ঠিক তেমনি এক রাতের শূন্যতায় বসে ছিল রাইহান—চোখে একরাশ প্রশ্ন, একরাশ কষ্ট। জানালার বাইরে আলো-আঁধারির খেলা, আর ভেতরে রাইহানের বুকের ভিতর চলছিল ঝড়।

সে জানে, তার ভালোবাসার নাম—নায়লা আক্তার।
আর সমাজের চোখে, এই নামই তার অপরাধ।

নায়লার সাথে পরিচয় হয়েছিল চার বছর আগে, একটা ডিবেট প্রতিযোগিতায়।
নায়লা পর্দানশীন, শান্ত মেয়ের ছদ্মবেশে এক আগুন।
আর রাইহান, বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা এক বইপোকা, যার জীবন শুধু রুটিনে বাঁধা ছিল।

কিন্তু ভালোবাসা তো রুটিন মানে না!

একদিন ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে হঠাৎ নায়লার চোখ পড়েছিল রাইহানের ওপর। সেই চশমা পড়া ছেলেটার মুখে ছিল না কোনো স্মার্টফোনের গ্ল্যামার, কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।

— "তুমি সবসময় এত গম্ভীর কেন?"
— "আমি গম্ভীর না, আমি সিরিয়াস।"

এই ছিল তাদের প্রথম কথা।

তারপর সেই কথাগুলো কাগজে গড়িয়েছিল, কাগজ থেকে চিঠিতে, চিঠি থেকে ফিসফিসে কণ্ঠে—
নায়লা কখনো উচ্চস্বরে বলেনি ‘ভালোবাসি’।
তবে রাইহান তা তার চোখে পড়ে পড়ে শিখে গিয়েছিল।

একদিন রাইহান বলেই ফেলেছিল—
— "নায়লা, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।"
নায়লার মুখ পড়ে গিয়েছিল।
সে বলেছিল—
— "রাইহান, তুমি জানো না, আমি কোথা থেকে এসেছি। আমার পরিবার, আমার সামাজিক পরিধি, আমার বাবা একজন আলেম। তোমার সাথে প্রেম করা মানেই আমার পরিবারের চোখে আমি কাফির!"

রাইহান থমকে গিয়েছিল।
কিন্তু ভালোবাসা কি ধর্ম দেখে আসে?
সে বলেছিল—
— "আমি তোমার বাবার কাছেই প্রস্তাব নিয়ে যাব। আমি তার থেকে জ্ঞানেই ছোট, চরিত্রে না।"

তারপরই শুরু হয়েছিল বাস্তব যুদ্ধ।

নায়লার বাবা রীতিমতো তাকে গালিগালাজ করে বলেছিলেন—
— "তুমি কসাই ঘরের ছেলে, আমার মেয়েকে নিয়ে সাপ্না দেখো কেন?"

হ্যাঁ, রাইহান ছিল কসাই পরিবারের সন্তান।
পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার পেছনে পৈতৃক পেশার ট্যাগ লেগে ছিল।

সে দিন রাতেই নায়লা কেঁদে কেঁদে বলেছিল,
— "তুমি প্লিজ চলে যাও রাইহান। আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমার ভালোবাসা তোমার জীবনকে নষ্ট করে দেবে।"

রাইহান কিছু বলেনি।
শুধু বলেছিল—
— "ভালোবাসা কি অপরাধ? যদি হয়, তাহলে আমি সেই অপরাধেই জীবন কাটিয়ে দেব।"

এরপর তিন বছর কেটে যায়।
নায়লা বিয়ের প্রস্তাবে ভেসে যায়, কিন্তু কাউকে গ্রহণ করে না।
রাইহান বিসিএস ক্যাডার হয়—উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
তবে সে কারো জীবন থেকে হঠাৎ হিরো হয়ে ফিরে আসেনি।

একদিন ঢাকায় এক সরকারি মিটিংয়ে রাইহানের বক্তৃতা চলছিল, তখনই দর্শকের সারি থেকে উঠে আসে এক কণ্ঠ—

— "আপনি কি এখনও ভালোবাসেন?"
সবাই অবাক।
রাইহান মাইক থামিয়ে বলে,
— "ভালোবাসা কি যায়?
ভালোবাসা তো অপরাধ নয়।
ভালোবাসা হলে সেটাই তো জীবন।"

সেই দর্শক ছিল—নায়লা।

পাঁচ বছর পর, দুইজনের চোখে দেখা হয়, হৃদয় কান্নায় ভেসে যায়।

নায়লার বাবা অসুস্থ। সেই মুহূর্তে রাইহান তার পাশে দাঁড়ায়, ওষুধ কিনে দেয়, হাসপাতালে দেখে।

অবশেষে একদিন নায়লার বাবা নিজে এসে বলে—
— "তুমি যদি এখনও আমার মেয়েকে ভালোবাসো, তবে নিয়ে যাও। আজ আমি বুঝি, ভালোবাসা ধর্ম না, ভালোবাসা হলো আল্লাহর দেওয়া শক্তি।"

সেই দিন, রাইহান ও নায়লার বিয়ে হয় একদম সাধারণভাবে—মসজিদের এক কোণে, হাতে হাতে মেহেদী, আর হৃদয়ে শান্তি।
47 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: