জুবায়ের হাসান রিমন—বয়স আটাশ, মুখে মিষ্টি হাসি আর মাথায় বিশাল সব প্ল্যান। নিজেকে "ফ্রিল্যান্সার" বলে দাবি করলেও, আশপাশের সবাই জানে সে মূলত ঘরে বসেই "লাইফ ডিজাইন" করে। যাকে বলে—না খেয়ে দিন কাটানোর আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। তবে রিমনের জীবনে একটা বড় ঘটনা ঘটেছে—তার বিয়ে হয়ে গেছে।
স্ত্রী রাইসা এখনো শ্বশুরবাড়িতেই আছে, আর জামাই রিমনের ইচ্ছা—একটা ইতিহাস গড়ে তোলা।
তাই সে পরিকল্পনা করেছে, নিজেই যাবে শ্বশুরবাড়ি।
মিশনের নাম দিয়েছে—“মিশন শ্বশুরবাড়ি”!
সকাল ৯টা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিমন নিজের চুলে অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে বলছে—
"দ্যাখেন মা, জামাই হইছি তো, জামাইরে মতোই দেখতে হইবো।"
মা পাশ থেকে মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
"তোরে তো জামাই না, সাইকেল রিকশা চালক মনে হয়। জামাই হলে তো জামাইগিরিও থাকতে হয়। কাজকর্ম না করে শ্বশুরবাড়ি গেলে তারা ভাববে কী?"
রিমন বুক ফুলিয়ে বলল,
"ভাবুক! আমি এমন জামাই, যারে দ্যাখলে শ্বশুর মুচকি হাসবে, শাশুড়ি বিরিয়ানি রান্না করবে, আর বউ লজ্জায় চোখ নিচু রাখবে!"
মা বললেন,
"তোরে দেখে তারা ডিম ভাজি বানাইলেই কপাল!"
যা-ই হোক, রিমনের থামার নাম নাই। পরনে একটা ঝকঝকে পাঞ্জাবি, পায়ে পয়েন্টেড জুতা (যেটা পরে একবার তিনি অটোরিকশা থেকে পড়ে গিয়েছিলেন), হাতে একটা চকচকে উপহার প্যাকেট (ভেতরে সাবানের সেট, কারণ ‘স্মার্ট জামাই’ বলেই নিজে থেকেই পরিষ্কার থাকার বার্তা দিতে চায়)।
রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল,
— “ভাই, কই যাইবেন?”
রিমন গম্ভীর গলায় বলল,
— “মিশন শ্বশুরবাড়ি! উড়ায়া চালান ভাই, জামাইরে যেন হেলান দিতে না হয়!”
শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে রিমন দরজায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল,
— “আসসালামু আলাইকুম! জামাই রাজা হাজির!”
শাশুড়ি দরজা খুলে হতবাক।
— “এই সকাল সকাল! কন কোনো ফোন নাই, মেসেজ নাই, এমনি এমনি হাজির?”
রিমন মিষ্টি হেসে বলল,
— “আচমকা যাওয়া মানেই তো আসল ভালোবাসা! আমি ভাবছিলাম, হঠাৎ আসলে বেশি খুশি হবেন।”
শাশুড়ি বললেন,
— “হঠাৎ গেলে মানুষ দ্যাশের নির্বাচনও ভয় পায়, জামাই তো মানুষ না!”
বউ রাইসা তখন রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে হেসে বলল,
— “এইটা কী, চুলে এত জেল? রিকশার পেছনে বসে উইগ মনে হইতেছে!”
রিমন বেজার মুখ করে বলল,
— “উইগ না বউ, এইটা হল জামাই প্রেজেন্টেশন! আরেকটু সম্মান দিলে হয় না?”
রাইসা হেসে চোখ নামিয়ে ফেলল। শাশুড়ি আবার গম্ভীর হয়ে বললেন,
— “বেশ, ভেতরে আয়। কিন্তু এখনই বলে রাখি, রান্নাঘরে কেউ যেতে দিব না। কালই চাল ফুরাইছে। তরকারি রান্ধছি আলু দিয়ে, তাতে জামাই গরুর মাংসের আশা করলে ভুল করবি।”
রিমন চুপচাপ মাথা ঝুঁকাল। তবে সে জানত—বীর জামাই সব অবস্থাতেই মানিয়ে নিতে জানে।
সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা চকচকে চকলেট বের করে ছোট শালার দিকে এগিয়ে দিল,
— “এই নে শামীম, তোর জন্য। একদম ফার্মেসির পাশে দোকান থেইকা আনা!”
শামীম বলল,
— “এইটা খাইছি গতবার। এবার কি আইফোন আনছো?”
রিমন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— “আইফোন তো আমার নিজেরও নাই বেটা...”
শামীম ঘাড় ঘুরিয়ে চলে গেল।
রিমন হাল ছাড়ে না। এবার শাশুড়ির কাছে গিয়ে বলল,
— “আম্মাজান, আমি নিজ হাতে রান্না করব। আজ থেকে ‘জামাইয়ের হাড়ি’ শুরু করি!”
শাশুড়ি হেসে বললেন,
— “তুই রান্না করবি? ওইদিন তো ডিম সেদ্ধ করতে গিয়ে গ্যাস শেষ করেছিলি!”
রাইসা ফিসফিস করে বলল,
— “তুমি ডিম ছাড়ো, বসে পেঁয়াজ কেটো, কান্না আসবে—সবাই ভাববে তুমি আবেগী জামাই!”
রিমন পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। দু’চোখে পানি, নাক দিয়ে সোঁ সোঁ শব্দ, আর মাঝে মাঝে বলছে,
— “এই কান্না শুধু পেঁয়াজের না, বউয়ের ভালোবাসারও।”
মাঝে মাঝে কিচেন থেকে আওয়াজ আসছে,
— “কোথায় গেল লবণ?”
— “জামাই নিয়ে গেছে!”
— “আর পেঁয়াজ?”
— “সেটাও উনি...”
একটা বেলায় খাবার টেবিলে বসে, রিমন বলল,
— “চালভাজা এত স্বাদ কিভাবে? চাটনি কোথা থেকে আসছে?”
শাশুড়ি বললেন,
— “চাটনি না রে জামাই, ওটা তোর ভেজে পোড়া লঙ্কা!”
রিমন শান্ত গলায় বলল,
— “আহা! এইটাই তো শ্বশুরবাড়ির আসল মজা। ভালোবাসা লঙ্কা দিয়েই বোঝা যায়!”
সবাই হেসে উঠল।
সন্ধ্যার দিকে রিমন বারান্দায় রাইসার পাশে বসে বলল,
— “কেমন হইল মিশন শ্বশুরবাড়ি?”
রাইসা হেসে বলল,
— “মিশন তো ভালোই। তবে এখন পর্যন্ত কেউ তোমারে ‘সেরা জামাই’ ঘোষণা করেনি!”
রিমন বলল,
— “আমি রাইসার জামাই, এইটাই তো পুরস্কার!”
পেছনে দাঁড়িয়ে শাশুড়ি বললেন,
— “শুধু পুরস্কার না, শাস্তিও! কাল বাজারে যাবে, দুই কেজি চাল আর এক কেজি পেঁয়াজ আনবি। জামাই হলে কষ্টও ভাগ করে নিতে হয়!”
রিমন হেসে বলল,
— “ঠিক আছে, কিন্তু রিকশা ভাড়া দিবেন তো?”
শাশুড়ি উত্তর দিলেন,
— “জামাইয়ের পকেটে টাকা না থাকলে বাজার কিভাবে করবে?”
রিমনের মুখ শুকিয়ে গেল। সে চোখ টিপে বলল,
— “মিশন শ্বশুরবাড়ি ছিল প্রথম দিন, কাল থেকে শুরু ‘মিশন বাজার!’”
---
শেষে সবাই একসাথে হাসল। আর রিমন বুঝে গেল—শ্বশুরবাড়িতে প্রেম পাওয়ার চেয়েও বেশি দরকার, এক চিমটি লবণ আর দুই চামচ ধৈর্য।
মিশন শ্বশুরবাড়ি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
51
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating