সুন্দরবনের কোলে ছায়াঘেরা এক গ্রাম, নাম জগন্নাথপুর।
সেই গ্রামে বেড়ে ওঠা দুইটি মন—অভিমন্যু মণ্ডল আর মেঘলা রায়।
অভিমন্যুদের বাড়ি একটু ভেতরে, কলাপাতা দিয়ে ছাওয়া দোচালা ঘর,
আর মেঘলাদের বাড়ি পুকুরপাড়ে—পাকা দালান, কিন্তু মন ছিল মাটির মতো।
অভিমন্যু বলে,
— “ভাইয়া, আমি একদিন অনেক বড় হবো… শহরে চাকরি করব।”
তার দাদা সুব্রত ভাইয়া হেসে বলে,
— “তুই বড় হবি না, তুই বড়ই হয়ে গেছিস... তোর চোখে এখন স্বপ্ন জ্বলে।”
অন্যদিকে মেঘলা পড়াশোনায় দারুণ। তার মিঠু আপু বলে,
— “মেঘু, তুই একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবি, জগন্নাথপুরে তোকে কেউ ছুঁতে পারবে না!”
মেঘলা হেসে বলে,
— “আমি বিশ্ববিদ্যালয় যাবো, কিন্তু ফিরবো তোমাদের জন্য।”
---
স্কুলজীবন থেকেই অভিমন্যু আর মেঘলা একে অপরের পাশে।
ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বে কেউ কিছু বলে না, কারণ গ্রামের মানুষ জানে—
ওদের হৃদয়ে কোনো কু-মতলব নেই। ওরা যেন একে অন্যের আয়না।
একদিন হাটের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অভিমন্যু বলল,
— “তুই জানিস মেঘু, তোর হাঁটার ছন্দটা একটা গান মনে করায়।”
মেঘলা হেসে বলে,
— “তুই নিজেই তো কবি হয়ে যাচ্ছিস! এবার বলবি, আমি তোর রাধা?”
অভিমন্যু একটু চুপ করে থেকে বলে,
— “রাধা তো কৃষ্ণেরই হয়, তাই না?”
মেঘলা মুখ ফিরিয়ে ফেলে, চোখে একটু কান্নার জল, কিন্তু বলে না কিছুই।
---
তাদের প্রেম কারো চোখে প্রেম না, যেন একটা নীরব বোঝাপড়া।
কিন্তু সময় তো আর থেমে থাকে না।
মেঘলার বাবা তাকে বিয়ে দিতে চায় শহরের এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে।
মেঘলা চুপচাপ মিঠু আপুকে বলল,
— “আপু, আমি কি সবকিছু ছেড়ে দিতে পারবো?”
মিঠু আপু কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— “তুই যদি আজ চুপ থাকিস, সারা জীবন কাঁদতে হবে মেঘু।”
অভিমন্যু জানে না কিছুই। সে তখন শহরে, গাজীপুরে একটি কারখানায় কাজ করে।
হঠাৎ মেঘলা একটি চিঠি পাঠায়—
---
“অভি,
তুই তো আমার কৃষ্ণ, আমি তোর রাধা হতে চাই।
আমরা যদি জন্মে জন্মে না পাই, তবে অন্তত এই জন্মে একবার ভালোবাসি চল…”
চিঠি পেয়ে অভিমন্যু রওনা দেয় বাড়ির পথে।
---
গ্রামের সেই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে, সে দেখে সিঁদুর পরা এক কনের সাজে মেঘলাকে।
কিন্তু মুখ দেখে বোঝা যায়—সে এই বিয়েতে নেই।
অভিমন্যু চিৎকার করে উঠে,
— “মেঘু! আমি তোর কৃষ্ণ, তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না!”
মেঘলার চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। সে এগিয়ে আসে, আর বলে,
— “তুই যদি আজ না আসতিস, আমি হয়তো বলেই উঠতে পারতাম না।”
গ্রামের মানুষ, আত্মীয়স্বজন, সবাই চমকে যায়।
কেউ বলে, "এই ছেলে তো গরীব!"
কেউ বলে, "এই মেয়ে কি পাগল!"
কিন্তু তখন মেঘলার ঠাকুরমা বলে উঠে,
— “ভালোবাসায় জন্মভেদ, টাকাভেদ নেই। আমি আশীর্বাদ দিলাম, ওরা থাকবে একসাথে।”
গ্রামের পণ্ডিতমশাইও বলেন,
— “যেখানে হৃদয়ে রাধা-কৃষ্ণের মিলন, সেখানে আর কিছু বলা চলে না।”
---
তাদের বিয়ে হয় ঠিক সেই পুকুরপাড়ে।
সিঁদুরদানের সময় অভিমন্যুর হাত কাঁপছিল, আর মেঘলার চোখে জল।
অভিমন্যু বলল,
— “আমি তোর হাত ধরলাম, তুই আর কাঁদবি না।”
মেঘলা বলল,
— “আমি শুধু হাসবো, কারণ এখন আমি তো তোর রাধা!”
তুমি তো আমার রাধা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
41
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating