তুষারের শহরে অপেক্ষা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর ইয়াকুতস্ক—
পৃথিবীর অন্যতম ঠান্ডা জনবসতি, যেখানে জানুয়ারির তাপমাত্রা মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায়।

এমন শীতের শহরে, তুষার যেমন জমে যায় জানালার কাঁচে, তেমনি কিছু গল্প জমে থাকে মানুষের মনের গভীরে।

এই শহরেই বাস করে আলেয়া ক্রাসনোভা।
তার বয়স মাত্র একুশ, কিন্তু চোখে একা থাকার দীর্ঘ অভ্যেস।
তার বাবা ছিলেন একজন ট্রেনচালক, মারা গেছেন ছয় বছর আগে। মা থাকেন সেন্ট পিটার্সবার্গে, নতুন সংসারে।
আলেয়া একা থাকে ঠাকুমার পুরোনো ফ্ল্যাটে, সাথে একটা সাদা বিড়াল—নাম ‘স্নেঝকো’ (মানে, বরফের দলা)।

তবে এই গল্প শুধু আলেয়ার নয়।
এই গল্পে আছে এক বাঙালি তরুণের গল্প, যার নাম সায়েফ রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ান ভাষা শিখে সে স্কলারশিপে রাশিয়ায় এসেছে—মস্কোতে পড়ে, তবে এবার সে এসেছে ইয়াকুতস্কে, একটি রিসার্চ প্রজেক্টে।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল পাবলিক লাইব্রেরিতে।
আলেয়া জানত, শহরে নতুন কেউ এসেছে।
ছেলেটি বাংলা বই খুঁজছিল, কিন্তু কিছুই পাচ্ছিল না।

তখন আলেয়া বলেছিল,
– "তুমি বাংলা পড়ো? তুমি ভারত থেকে?"
সায়েফ মুচকি হেসে বলেছিল,
– "না, বাংলাদেশ। বাংলা আমার প্রাণ।"

আলেয়া যেন অবাক হয়েছিল, এই ঠান্ডার দেশে কেউ বাংলা ভাষা নিয়ে এতটা ভালোবাসা বয়ে এনেছে দেখে।


---

দিন গড়াতে থাকে।

আলেয়া আর সায়েফ একসাথে কফি খায়, তুষারের ভিতর হাঁটে, পুরোনো কবিতার বই পড়ে।

একবার সায়েফ বলেছিল—
– "তোমার জানো, বাংলা ভাষায় একটা শব্দ আছে—‘অপেক্ষা’। মানে, কাউকে চুপচাপ ভালোবেসে বসে থাকা।"
আলেয়া বলেছিল,
– "রাশিয়ান ভাষায় ‘ঝদানি’—মানে, শুধু সময় নয়, মন দিয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করা।"

তারা বুঝতে পেরেছিল—দুটি ভাষা, দুটি দেশ, কিন্তু অনুভব একই।
ভালোবাসা কোনো সীমান্ত মানে না।


---

কিন্তু আলেয়া কখনো সায়েফকে বলেনি,
তার জীবনে ছিল এক পুরনো গল্প।
তিন বছর আগে, সে কারো প্রেমে পড়েছিল। সেই ছেলে তাকে ঠকিয়েছিল, মস্কোতে নিয়ে গিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করেছিল।
আলেয়া ভেঙে পড়েছিল, তারপর থেকেই মানুষের উপর থেকে তার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল।

তবু সায়েফের চোখে কিছু ছিল—শান্ত, গভীর, কোনো চাহিদা ছাড়া।

এক রাতে তুষার ঝরছিল প্রবলভাবে।
বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল পুরো পাড়া জুড়ে।
আলেয়া জানালা খুলে দাঁড়িয়েছিল, আর তখন হঠাৎ সায়েফ চলে এল।

হাত দুটোতে গরম স্যুপ আর একটা ছোট্ট প্যাকেট।
সে বলল,
– "আমি জানি, তোমার ঠাণ্ডা লাগছে। আমি এসেছি, শুধু তোমাকে জড়িয়ে রাখার জন্য না—তোমার একাকীত্বটা বুঝতে।"

আলেয়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে আস্তে বলল,
– "তুমি চলে যাবে, তাই না? প্রজেক্ট শেষ হলে?"
সায়েফ মাথা নিচু করে বলল,
– "হয়তো। কিন্তু আমি অপেক্ষা করব। যদি তুমি একদিন বলো, ‘চলো, একসাথে থাকি’। আমি সেই দিনটির জন্যই বাঁচব।"


---

তিন মাস কেটে গেল।

সায়েফ রিসার্চ শেষ করে মস্কো চলে গেল।
আলেয়া তেমন কিছু বলল না, শুধু বিদায়ের রাতে তার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিল।
সায়েফ অনেক দিন পর খুলে দেখেছিল, সেখানে লেখা ছিল—

“তুমি যদি একদিন আবার ইয়াকুতস্কে ফিরে আসো, জানবে কেউ অপেক্ষা করে আছে। সেই জানালার পাশে, যেখানে তুষার জমে থাকে।’’
38 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: