ইসলামাবাদের আকাশটা আজ কিছুটা মেঘলা।
মেঘের ভেতর এক ধরনের নীরবতা থাকে—ঠিক যেমন থাকে কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসার গভীরে।
মেহরিন জানে, আজকের দিনটা কিছুটা আলাদা।
আজ সে চিঠি লিখবে, সেই ছেলেটিকে, যাকে হয়তো কখনোই ছুঁতে পারবে না।
তবু সে লিখবে।
সে লিখল—
"আসসালামু আলাইকুম আরিফ,
তুমি কি এখনো ইসলামাবাদের বৃষ্টি অনুভব করো? নাকি লাহোরের আকাশেই তোমার মন আটকে গেছে?"
আরিফ আর মেহরিনের পরিচয় হয়েছিল এক আন্তর্জাতিক বইমেলায়, করাচিতে।
মেহরিন তখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী।
আরিফ, লাহোরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ছে।
তাদের প্রথম আলাপের সূচনা হয়েছিল একটি বইয়ের স্টলে, যেখানে আরিফ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ফয়জ আহমেদের কবিতার বই—
“দাস্তানে-গম”।
মেহরিন বলেছিল,
– “তুমি কি শুধু পড়ো, নাকি হৃদয়েও রাখো এই দুঃখগুলোকে?”
আরিফ তাকিয়েছিল তার দিকে।
চোখে কেমন যেন অবাক হওয়া চাহনি।
সে বলেছিল,
– “কিছু দুঃখ শুধু বইয়ের পাতায় রাখার নয়, কিছু দুঃখ বুকেও বাসা বাঁধে।”
এই এক কথার ভেতর দিয়েই তারা দু'জন মনের দিক থেকে কাছাকাছি এসেছিল।
কোনো প্রেমের মঞ্চে নয়,
কোনো সাজানো ভঙ্গিতে নয়—
শুধু কথার ভেতর দিয়ে, অনুভবের সূক্ষ্ম চলনে।
---
তারা প্রেমে পড়েছিল?
নাকি দুই ভিন্ন শহরের দুই মন শুধু কিছু অনুভব ভাগ করে নিয়েছিল?
একবার করাচির বন্দর থেকে আরিফ বলেছিল—
– “আমি যদি বলি, তোমার কাছে এসে চায়ের কাপ দুটো হাতে নিয়ে বসতে চাই... তুমি কী করবে?”
মেহরিন এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলেছিল—
– “আমি তখন আমার পুরনো কাপড়গুলোর মাঝে সেই নতুন কাপ জোড়াকে স্থান দেবো।”
এমনই ছিল তাদের সম্পর্ক।
না প্রেম, না বন্ধুত্ব—
একটা অস্পষ্ট নামহীন বাঁধন।
---
কিন্তু পাকিস্তান শুধু কবিতার দেশ নয়, এখানে ধর্ম, পরিবার, সমাজ—সব মিলিয়ে ভালোবাসাকে অনেক সময় লুকিয়ে ফেলতে হয়।
আরিফ একদিন জানাল,
– “আম্মাজান আমার জন্য পাত্রী দেখে ফেলেছেন। আমি ‘না’ বলতে পারিনি। আমি বললে তাঁরা কষ্ট পাবেন। আমার ছোট দুই বোনের ভবিষ্যৎও ঝুলে যাবে।”
মেহরিন বুঝতে পেরেছিল, ভালোবাসা যদি দুই মানুষকে না ভাঙে, তবে সমাজ নিশ্চয় পারে।
সে শুধু বলেছিল,
– “আরিফ, আমি চাই না তুমি পরিবারের বিরুদ্ধ গিয়ে ভালোবাসো। আমি চাই তুমি শান্তিতে থাকো। তবে আমার কবিতার পাতায় তুমি চিরকাল থাকবে।"
আরিফ বলেছিল,
– “তুমি আমার জীবনের সেই অসমাপ্ত লাইন, যা আর কোনোদিন সম্পূর্ণ হবে না। কিন্তু থাকবে, প্রতিটি পাতার পাশে, ছায়ার মতো।”
---
আজ চার বছর কেটে গেছে।
মেহরিন এখন করাচিতে একটি মেয়েদের কলেজে শিক্ষকতা করে।
আরিফ হয়তো এখন একজন খ্যাতনামা রিপোর্টার, লাহোরেই।
তারা কখনো আর কথা বলেনি।
তবে আজ, মেহরিন আবার চিঠি লিখে, ছিঁড়ে ফেলল।
শেষে শুধু মনে মনে বলল—
“তুমি কি জানো, মেঘ ঝরে কেমন করে? ঠিক তেমনি ঝরে পড়েছিলাম তোমার চোখের আকাশে।”
তুমি কি জানো মেঘ ঝড়ে কেমন করে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
39
Views
3
Likes
0
Comments
0.0
Rating