ডার্ক কুইন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গভীর জঙ্গল ঘেরা এক প্রাচীন রাজ্য—নূরনগর। ইতিহাসে যার নাম ছিল স্বর্ণাক্ষরে লেখা, আর রহস্যে মোড়া এক রানির শাসনকালের জন্য যতটা বিখ্যাত, ততটাই ভয়ংকর। কেউ কেউ তাকে বলে ডার্ক কুইন, কেউ আবার বলে নূরের রানী। কেউ জানে না আসলে সে কে ছিল, কোথা থেকে এসেছিল, কেন কেউ তার চোখে চোখ রাখতে পারত না।

এই গল্পটা শুরু হয় বর্তমান ঢাকায়। এক ছাত্রী, নাম তার মাহজাবীন। ইতিহাস বিভাগে পড়ে, গবেষণার বিষয়: নূরনগর রাজ্য ও তার হারিয়ে যাওয়া রানি। সে জানত, এই রানিকে নিয়ে গল্প অনেক, কিন্তু সত্য কেউ জানে না। মাহজাবীন ঠিক করল, সে এই রহস্য ভেদ করবে।

তার হাতে ছিল একটা প্রাচীন নকশা, যেখানে জঙ্গলের ভেতরকার নূরনগরের ধ্বংসাবশেষের পথ আঁকা। এটা তার নানা রেখে গিয়েছিল—একজন পুরাতত্ত্ববিদ, যার মৃত্যু হয়েছিল রহস্যজনকভাবে এই রাজ্যের সন্ধান করতে গিয়ে।

একটা বিকেলে, বন্ধুদের অজান্তে মাহজাবীন রওনা দিল নূরনগরের পথে। সাত দিনের জার্নি, পাহাড়, নদী, জঙ্গল পেরিয়ে যখন সে পৌঁছাল এক ধ্বংসস্তূপে, তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হল বাতাস থেমে গেছে। পাখির ডাক নেই, পশুর শব্দ নেই, চারপাশ যেন গিলে নিচ্ছে।

হঠাৎ ঝোপের ভেতর থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর—
– “তুমি এসেছো, অনেক দেরি করে।”

মাহজাবীন চমকে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী, পরনে কালো কাপড়, চোখে অদ্ভুত লাল ছায়া। চুল কাঁধ ছাড়িয়ে, মুখে রহস্য।

– “তুমি কে?”
– “আমি? আমি সেই যাকে সবাই ভুলে গেছে, কিন্তু আমি কাউকে ভুলি না।”
– “ডার্ক কুইন?”

নারী হেসে ফেলল।
– “তুমি যদি নাম দিতে চাও, রাখো। তবে আমি নূর। আর এই রাজ্য আমার ছিল, এখনো আছে।”

মাহজাবীন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তার চোখে এক বিন্দু ভয় নেই। সে যেন অনুভব করে, এই রানি মৃত নয়, বরং বহু শতাব্দী ধরে বেঁচে আছে, ছায়ার আড়ালে।

রানী নূর মাহজাবীনকে নিয়ে গেল জঙ্গলের আরও ভিতরে—একটা গুহার ভেতর দিয়ে, যেখানে ছিল একটা লুকানো প্রাসাদ। ছায়ায় ছায়ায় বাঁধা দেয়াল, ঘড়ির শব্দ নেই, সময় যেন স্থির।

– “তুমি কি মানুষ?”
– “মানুষ আর দানবের মাঝামাঝি ছিলাম এক সময়। যেদিন আমার ভালোবাসা বিশ্বাসঘাতকতা করল, সেদিন আমি আর মৃত কিংবা জীবিত ছিলাম না। সেদিন থেকে আমি রাতের রানী।”

তাদের কথায় জানা যায়, বহু বছর আগে এই রাজ্যের শাসন ছিল মহারাজ কাসিম খানের হাতে। তার একমাত্র কন্যা ছিল নূরজান। বুদ্ধিমতী, সাহসী, বিদ্বান। কিন্তু রাজপ্রাসাদে রীতিনীতি অনুযায়ী, তাকে বিয়ে দেওয়া হয় পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যের রাজপুত্রের সঙ্গে।

কিন্তু সেই রাজপুত্র এক বিশ্বাসঘাতক। রাজ্য দখলের জন্য বিয়ে করেছিল, এবং একদিন রাতে সে হত্যার ছক কষেছিল। কিন্তু কাসিম খানের মৃত্যুর পর, রানি নূরজান তার আসল রূপ দেখায়—সে মন্ত্র জানত, শক্তি জানত, এক গোপন সাধকের কাছ থেকে পাওয়া কালো বিদ্যার জোরে সে রাজ্য রক্ষা করেছিল, কিন্তু তার হৃদয় চিরকাল পোড়া হয়ে গিয়েছিল।

তারপর এক রাতেই রাজ্য অদৃশ্য হয়ে যায় ইতিহাস থেকে। কেউ জানে না কীভাবে।

মাহজাবীন ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে, সে আসলে শুধু একজন গবেষক নয়—তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই রাজ্যের অতীত। রানি তাকে বলল—
– “তুমি আমার রক্তের উত্তরসূরি। তোমার মধ্যে আছে আমার জ্ঞান, আমার যন্ত্রণা, আর আমার শক্তি।
তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে রাজ্য ফিরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু এর একটা মূল্য আছে।”

– “কী মূল্য?”

– “তুমি আর সাধারণ থাকবে না। তুমি আমার মতো হবে। যে প্রেম করলেও দখল চায় না, অথচ সারা জীবন শূন্যে ভাসে। যে রাজত্ব পায়, কিন্তু শান্তি পায় না।”

মাহজাবীন জানত, তার সামনে দুটো পথ—
এক, ফিরে যাওয়া, ভুলে যাওয়া সব;
আর দুই, এই শূন্য রাজ্য গ্রহণ করা।

সে রাত্রির গভীরে, এক শপথ নিল।

তিন মাস পর, ঢাকায় একটা আন্তর্জাতিক ইতিহাস সম্মেলন। এক মেয়ের উপস্থাপনা সবার মন কেড়ে নিল—
“নূরনগর: ইতিহাস না কিংবদন্তি?”

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, উপস্থাপনাকারীর নাম কোথাও নেই। কেউ তাকে চিনে না। কেউ জানে না, কোথা থেকে এলো।

কিন্তু একটা পাতা পেয়েছিল কনফারেন্সের শেষে—
তাতে লেখা ছিল:
“তোমরা ইতিহাস লেখো মাটির উপর দাঁড়িয়ে।
আমি লিখি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে।
আমি নূরজান, আমি ডার্ক কুইন, আমি ফিরেছি—তবে আমার নামে নয়, তোমাদের মাঝেই।”
60 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: