মনের বোঝাপড়া

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ঢাকার পুরান এলাকায়, চকবাজারের এক সরু গলিতে একটা পুরোনো বাড়ি—যার দেয়ালে ছোপ ছোপ সাদা রঙের ফাঁক, কাঠের জানালায় মরিচা ধরা খাঁচা, আর ছাদে ছোট ছোট পায়রার বাসা। সেখানেই বড় হয়েছে ফারহান আর মিনহাজ। দুজনেই এক বাড়ির ভাড়াটিয়া—তবে দুই তলায় থাকে ফারহান, নিচতলায় মিনহাজ। ছোটবেলায় তারা একসাথে পাটিগণিত শিখেছে, ক্বারীতে কোরআন পড়েছে, ছাদে উঠে চিল উড়িয়েছে, ঈদের নামাজে একই সারিতে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এখন দুজনেই বিশ-পঁচিশের তরুণ, পৃথিবীটা একটাই থাকলেও, তাদের দুনিয়া এখন অনেক আলাদা।

ফারহান পড়ে ইংরেজি সাহিত্যে। মুখে সব সময় কবিতার লাইন ঘোরে, চোখে একধরনের ভাবুকতা। অন্যদিকে মিনহাজ অর্থনীতির ছাত্র—গোঁফে আগুন, কথায় যুক্তি, আর জীবন নিয়ে খুব হিসেবি।

ফারহান এক বিকেলে ছাদে বসে কফি খাচ্ছিল। একটা বই খুলে রেখেছে—“Love in the Time of Cholera”। পাশে বাতাসে নড়ছে একটা ছড়ানো পাতার গাছ। হঠাৎ নিচ থেকে মিনহাজ ডাক দিলো,
– “ঐ ফারহান ভাই, আপনি কি প্রেমে পড়েছেন?”
ফারহান হাসলো, বলল,
– “কেন, আমার চেহারায় লেখা আছে নাকি?”
– “না ভাই, আপনি এই ক’দিনে এত বই পড়েছেন, এত কফি খেয়েছেন, আমি ভাবলাম হয়তো মনোযোগ কোনো ‘মন’–এর দিকেই আছে।”

ফারহান চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে,
– “আসলে প্রেমটা বুঝতে গেলে অনেক আগে থেকেই মনের বোঝাপড়া দরকার হয়, তাই না?”
– “বুঝলাম না।”

সেই দিন রাতে ফারহান ডায়েরিতে লিখে ফেলল—
“যাকে নিয়ে ভাবছি, তার সঙ্গে হয়তো কোনোদিন বোঝাপড়া হবে না। অথচ আমার মনের সব শব্দ যেন সেই অচেনা মানুষটার চারপাশে ঘোরে।”

পরদিন মিনহাজ ফারহানের ঘরে ঢুকে দেখল টেবিলের ওপরে একটা নাম লেখা—"নাহিলা"।
– “নাহিলা কে?”
ফারহান প্রথমে চমকে উঠল, তারপর বলল,
– “তোমার ইউনিভার্সিটিতে পড়ে না?”
– “ওহ, ওই নাহিলা! হ্যাঁ, ক্লাসে চুপচাপ থাকে, চোখে চশমা পরে। বেশ পড়ুয়া। তুমি কীভাবে চিনো?”
– “একবার লাইব্রেরিতে পাশে বসে ছিল। তখন ও একটা কবিতার বই পড়ছিল—‘নাজিম হিকমত’। আমি তাকিয়ে ছিলাম, ও হঠাৎ বলল,
‘তাকাবেন, তাতে দোষ নেই, তবে চোখে প্রশ্ন রাখবেন না।’
আমি তখন থেকেই ভাবছি—এমন কেউ হয় কীভাবে?”

মিনহাজ হেসে ফেলে। বলল,
– “তাহলে শুরু করো। এক কাজ করো, আমি ওকে একটু একদিন ক্লাসের পরে ছাদে নিয়ে আসি।”

ফারহান থতমত খেয়ে যায়।
– “ধর যদি ও আমাকে অপ্রস্তুত করে দেয়?”
– “তবে বুঝবে, প্রেমটা একতরফা ছিল না, শুধু বোঝাপড়া ছিল একপাশা।”

সেই শুক্রবার বিকেলে মিনহাজ ছাদে নিয়ে আসে নাহিলাকে। একটা সাধারণ হেলো হাই দিয়ে শুরু হয়। ফারহান বেশি কিছু বলে না। শুধু জিজ্ঞেস করে,
– “আপনি কি লেখেন?”
নাহিলা উত্তর দেয়,
– “ভালোবাসি, তবে লেখা শুরু করিনি।”
– “ভালোবাসা আগে, লেখা পরে—এটাই তো সবচেয়ে দরকারি।”

সেই এক ঘণ্টার কথায় কিছু বুঝা গেল না, তবে চোখে চোখে অনেক কিছু আদান-প্রদান হল।

এরপর দিন যায়, সপ্তাহ যায়। ফারহান মাঝেমধ্যে নাহিলাকে মেসেজ করে—ছোট্ট কবিতা, বা কোনো বইয়ের পাতা। নাহিলা কখনো উত্তর দেয়, কখনো দেয় না। তবে মুখোমুখি হলে সবসময় একটা হাসি দেয়, যেটা অস্বস্তিকর নয়, বরং আশ্বাস দেয়।

একদিন বিকেলে মিনহাজ এসে বলল,
– “তুই কি এখনো বুঝতে পারলি না, ওর মনে কী?”
– “বোঝা যায় না। আমি মনে করি, আমাদের দুজনের মধ্যে শব্দ অনেক, কিন্তু বাক্য গড়ে উঠছে না।”
– “তোর সমস্যাটা জানিস কি? তুই অপেক্ষা করিস বোঝাপড়ার, কিন্তু সাহস করিস না সত্যি জানার।”

সেদিন রাতে ফারহান লিখল,
“মনের বোঝাপড়া যদি মুখে না আসে, তাহলে সেটা কখনো সম্পর্ক হয়ে উঠতে পারে না।”

শেষমেশ একদিন সাহস করে নাহিলাকে দেখা করতে বলল। পুরান ঢাকা ছেড়ে, নতুন শহরের এক শান্ত কফি শপে।

দুজন বসলো। নাহিলা খুব শান্ত। ফারহান এবার কিছু না লুকিয়ে বলল,
– “আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু সেটা তোমাকে পছন্দ করে নয়, বরং তোমার মতো একজন মানুষকে নিজের মনের সঙ্গে মেলাতে পেরে।”

নাহিলা চুপ করে ছিল, বেশ কিছুক্ষণ। তারপর শুধু বলল,
– “তুমি জানো, আমি কখনো কাউকে বলতে পারিনি যে আমি কাকে ভালোবাসি। আমি এমনকি নিজেকেও না।
তুমি আজ বললে। আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা জানি না, তবে আমার মনের এক কোণে তুমি প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকো—এইটুকু সত্য।”

সেদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল,
প্রেমটা নিয়ে কিছু না ভাবার।
প্রেমটা না থাকলে না থাকুক,
তবে বোঝাপড়া থাকবে।

দিন যেতে লাগলো। তারা প্রেমে পড়ল না, তারা বন্ধুত্বে গড়ে তুলল এক এমন সম্পর্ক, যেখানে কেউ কাউকে দখলে নিল না। কেউ কারো দিকে চিৎকার করে কিছু চাইল না।

তাদের সম্পর্ককে কেউ ‘প্রেম’ বলত না, কেউ ‘বন্ধুত্ব’ বলত না—তবে সবাই জানত,
ওরা একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না।

একদিন ফারহান বলল,
– “এই যুগে প্রেম হওয়ার আগেই প্রত্যাশা জন্মায়। আর আমাদের মাঝে প্রেম হয়নি, কিন্তু বোঝাপড়া হয়েছে।
তাই আমি মনে করি, আমাদের সম্পর্ক প্রেমের থেকেও বড়।”

নাহিলা হেসে উত্তর দিল,
– “ঠিক এই কারণেই, আমি তবুও তাকেই চাই। যে প্রেম না চেয়ে, বুঝে পাশে থাকে।”
41 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: