তবুও তোকেই চাই

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
মির্জানগর গ্রামটা খুব বড় নয়, কিন্তু নামডাক আছে চারদিকে। খাল-বিল, পাখি ডাকা গাছ, আর কুয়াশায় মোড়ানো সকাল—এখানেই মানুষ দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়, শহরের মুখ দেখে না। এই গ্রামেরই সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ ছিল আজগর আলী খান সাহেব। জমিদারি আগের মতো না থাকলেও, ধন-সম্পদে তার ঘাটতি ছিল না।

আজগর সাহেবের একমাত্র মেয়ে হুরিয়া। পড়াশোনা শিখেছে বাড়িতেই—উর্দু, ফারসি আর কোরআন পড়ে। বাইরে তেমন যাওয়া হয় না, তবে তার চোখে একটা অদ্ভুত কৌতূহল, যা একটা মেয়ের ভিতরে যখন জমে থাকে, তখন সে আর সাধারণ থাকে না। মেয়েটা চুপচাপ, কিন্তু মনে হয়, ভিতরে এক ঝড়।

অন্যদিকে ছিল সায়েফ। তার বাবা গ্রামের মক্তব চালান, সায়েফ ছোট থেকেই পড়াশোনায় ভালো, শান্ত স্বভাবের। ধর্মীয় জ্ঞান থাকলেও, ওর মনটা পড়ে থাকে অন্য জায়গায়—বইয়ের জগতে। সবসময় স্বপ্ন দেখত, যদি একদিন নিজের একটা লাইব্রেরি করতে পারত! গ্রামের বাচ্চারা এসে পড়বে, বই ছুঁয়ে নতুন করে বাঁচবে।

সায়েফ আর হুরিয়ার দেখা হয়েছিল এক বর্ষার দিনে। খালপাড়ের পথ দিয়ে সায়েফ হেঁটে যাচ্ছিল, আর উল্টো দিক থেকে হুরিয়ার পালকি আসছিল। হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটায় ওড়নার এক অংশ উঠে যায়, আর সেখানেই চোখে পড়ে সায়েফের—সেই দৃষ্টিটা।

চোখে চোখ পড়া মানেই কি প্রেম? না, কিন্তু সেই দিনে, সেই সময়ে, ওটাই ছিল শুরু।

এরপর প্রায়ই সেই পথ দিয়ে যেত সায়েফ। কখনও পালকি দেখত, কখনও দেখত না। আর হুরিয়া? সে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকত, কখন সেই ছেলেটা হেঁটে যায়। কিছুদিন পর, কাজের মেয়ের হাত দিয়ে একটা ছোট্ট কাগজ গেল—

“আপনি যে চোখে তাকান, তাতে আমার বুক কাঁপে। আমি হুরিয়া। আপনার নামটা কি?”

সায়েফ অবাক হয়ে গেল। তারপর থেকে শুরু হল ছোট ছোট চিঠি চালাচালি। মাঝে মাঝে দেখা, দূর থেকে। কথা খুব কম, কিন্তু লেখার ভিতরে গড়ে উঠল এক গোপন সম্পর্ক।

কিন্তু সব গল্পই তো সুখের না।

যেদিন আজগর সাহেব খবর পেয়েছিলেন, তার মেয়ে একজন গরিব মক্তব মাস্টারের ছেলের সঙ্গে কথা বলে—সেদিন গ্রাম কেঁপে উঠেছিল।
তিনি হুকুম দিলেন—
– “ও মেয়ের ঘর থেকে আর বেরোনো যাবে না। বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা হচ্ছে। আর ছেলেটাকে গ্রামছাড়া করো।”

সায়েফ আর হুরিয়া তখন কিছুই করতে পারছিল না।
তবুও একরকম করে সায়েফ শেষ একটা চিঠি পাঠাতে চেয়েছিল—

“তুমি আমার আলো। আমি তোমাকে দখল করতে চাই না, শুধু চাই—তুমি বুঝো, আমি কেমন করে ভালোবাসি। যদি কখনো সুযোগ পাও, এসে দাঁড়াও আমার সামনে। আমি চিরকাল অপেক্ষা করবো।”

কিন্তু সেই চিঠি পৌঁছায়নি। মাঝরাস্তায় ধরা পড়ে যায়।
সায়েফকে ডেকে পাঠানো হয় গ্রামের পঞ্চায়েতে। রায় হল—তাকে গ্রাম ছাড়তে হবে। যদি আবার দেখা যায়, তাহলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সেই রাতে সায়েফ ছুটে গিয়েছিল খালপাড়ে। যেখানে হুরিয়ার পালকি প্রথমবার দেখা গিয়েছিল। সে জানত, আর দেখা হবে না। তবুও সে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকক্ষণ।

পরদিন সকালে হুরিয়ার ঘর ফাঁকা। কেউ জানে না সে কোথায় গেছে। কেউ খোঁজও করে না। কারণ সমাজে এটা কলঙ্কের মতো, সবাই চায় ভুলে যেতে।

পঁচিশ বছর কেটে গেছে।

১৯৫০ সালের শেষদিকে, শহরতলির এক মফস্বল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক বৃদ্ধা। চুল পেকে গেছে, মুখে অদ্ভুত এক শান্তি। লাইব্রেরির নাম—“হুরিয়ার ঘর”।

ভিতরে বসে ছিল সায়েফ। হাতে একটা পুরোনো বই, চশমা পরে পড়ছিল। এক সময় তাকিয়ে দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সেই মুখ। প্রথমে চিনতে পারেনি, তারপর এক মুহূর্তেই বুক কেঁপে উঠল।

দু’জনের মুখে কোনো কথা নেই। অনেক কিছু বলার ছিল, কিন্তু মুখ থেমে থাকল।

সায়েফ হেসে বলল,
– “তুমি এসেছো?”

হুরিয়া উত্তর দিলো,
– “তুমি তো অপেক্ষা করতে বলেছিলে। আমি দেরি করলাম, কিন্তু এলাম তো।”

আর কিছু বলার ছিল না।
43 Views
2 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: