মিলন হবে কতদিনে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাতের ঢাকা শহর অন্যরকম, যত রাত বাড়ে, তত নিঃসঙ্গতা চেপে বসে।
আয়াতুল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সাদা ওড়নাটা বুক জড়িয়ে রেখেছে, যেন সেইই একমাত্র ঢাল। তিন বছর আগে বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল, তিন বছর পেরিয়ে গেছে, মিলন হয়নি। মাহিরের শেষ মেসেজটা এখনো তার ফোনে, “তুমি আমার ধৈর্যের শেষ সীমা, জানি একদিন আসবে… যদি দেরিও করো, তবুও আমি থাকবো।”

পাশ থেকে মায়ের কণ্ঠে ভেসে এলো, “তোমার চাচা আসছেন কাল, বিয়ের প্রস্তাবটা ভালো… তুমি এবার রাজি হয়ে যাও আয়াত।”
মা'র কথার কোনো উত্তর দিল না সে। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল। মনে মনে বলল,
"যদি চিৎকার করে বলতে পারতাম—আমি কারো নই, আমি মাহিরের!"

আয়াতের মাহিরকে ভালোবাসা যেন আরামের ছিল না, ছিল না ছন্দে বাঁধা—ছিল এক অসম প্রেম, যেখানে ধর্ম, জাত, পারিবারিক দম্ভ, অবস্থান সবকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাহির ছিল একজন লাইব্রেরিয়ান—ঢাকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বাবা-মা কেউ নেই, মেসে থাকে। স্বপ্ন দেখে একটা ছোট ঘর আর এক মুঠো শান্তির। অন্যদিকে আয়াতুলের বাবা সাবেক সচিব, মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। একমাত্র মেয়ে আয়াতুল চায় লেখিকা হতে, কিন্তু পরিবার তাকে সমাজের "উঁচু গোষ্ঠীর যোগ্য" পাত্র খুঁজে দিতে ব্যস্ত।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বইয়ের প্রদর্শনীতে। মাহির পুরোনো বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে ছিল, আয়াতুল চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ‘রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র’ খুঁজতে। ভুলক্রমে মাহির তার হাতে দিয়ে দিয়েছিল ‘বঙ্কিমচন্দ্র’। আয়াতুল ভ্রু কুঁচকে বলেছিল,
– “আপনি কি জানেন আমি কী খুঁজছি?”
মাহির হেসে বলেছিল,
– “জানতাম না… এখন জানলাম। তবে আপনার চোখে যেভাবে বই খোঁজেন, সেটা বুঝতে পারা কঠিন নয়।”

সেই হাসির মধ্যেই জন্ম নেয় এক অসম্ভব।

মাহির কখনো তার ভালোবাসা জানানোর জন্য ব্যর্থতার ভয় পায়নি, কারণ সে জানত, তার হাতে কিছু নেই—শুধু সত্যি ভালোবাসা ছাড়া। আয়াত প্রথমদিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও, ধীরে ধীরে মাহিরের শান্ত, গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিল—এ মানুষ মিথ্যে বলে না।

আস্তে আস্তে গল্প জমে, তারা প্রায় প্রতিদিন দেখা করত—কখনো টিএসসিতে, কখনো পুরোনো বইয়ের গলিতে। আয়াতের জন্য মাহির একটা পুরোনো নোটবুক রেখেছিল, যেখানে সে প্রতিদিন লিখত আয়াতকে নিয়ে তার চিন্তা, স্বপ্ন, ভয়, দুঃখ, আশা। সে নোটবুক একদিন আয়াতকে দিয়ে বলেছিল,
– “এটা আমার ডায়েরি না… এটা তোমার প্রতিচ্ছবি। পড়লে বুঝবে, আমি কেমন করে তোমায় ভালোবাসি।”

কিন্তু ভালোবাসা শুধু অনুভবেই থাকে না, তাকে প্রকাশ করতে হয়—পরিবারের সামনে, সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

যেদিন মাহির আয়াতের বাবার কাছে গিয়েছিল, সেদিন তার সব সাহস ভেঙে গিয়েছিল।
বাবা প্রথমে থমকে তাকিয়ে ছিলেন, তারপর বলেছিলেন,
– “তুমি কী মনে করে ভেবেছো, আমার মেয়ে তোমার মতো একজন লাইব্রেরির কর্মচারীর সঙ্গে জীবন কাটাবে? পড়াশোনার খরচ আছে, ভবিষ্যৎ আছে, সামাজিক অবস্থান আছে—এসব কিচ্ছু বোঝো না?”
মাহির শান্তভাবে বলেছিল,
– “আমি শুধু ওকে ভালোবাসি। আমি জানি, আমি ওর লায়েক না আপনার চোখে, কিন্তু ওর ভালোবাসার যোগ্য আমি। আমি কিছুদিন সময় চাই, আমি কিছু করে দেখাতে চাই, শুধু সময় দিন।”

বাবা সোজাসুজি বলেছিলেন,
– “তুমি কাল থেকেই আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবে না। নয়তো আমি ওকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবো।”

সেদিনই প্রথমবার আয়াত তার বাবার উপর রেগে গিয়েছিল, আর সেদিনই মাহির আর তাকে ফোন করেনি। শুধু একটা ছোট্ট কাগজে লিখে গিয়েছিল:
“তুমি চাইলেই আমি অপেক্ষা করতে পারি… শুধু বলো তুমি এখনও বিশ্বাস করো কি না।”

তিন বছর পেরিয়ে গেছে। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে, কিন্তু আয়াত কখনোই অন্য কাউকে মনের দরজা খুলে দিতে পারেনি।

আজ আবার একজন আসবে দেখতে—“চাকরি বিদেশে, ডাক্তার, ভালো ঘর।”
আয়াতের মন একটুও নড়ল না।

সন্ধ্যাবেলায় সে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে, আর গেল সেই পুরোনো লাইব্রেরি স্টলের পাশে। যেখানে মাহির একসময় বই বিক্রি করত। দোকান নেই, স্টলও নেই। আছে শুধু একটা ভাঙা চেয়ারে বসা এক বৃদ্ধ লোক, তার চোখে শুষ্কতা।
আয়াত জিজ্ঞেস করল,
– “এই জায়গায় আগে এক মাহির ভাই ছিলেন, তিনি কোথায় এখন?”
লোকটা একটু হাসল, বলল,
– “তিন বছর ধরে আসেন না। শুনেছি শহরের বাইরে কোথাও চলে গেছেন। নাকি নিজের একটা বইয়ের ঘর খুলবেন বলে স্বপ্ন ছিল ওর।”

আয়াত ফিরে এল, চোখের কোণে লেগে ছিল এক ধরণের পোড়া অশ্রু।

বাড়ি ফিরে সে একটা চিঠি লিখল। লিখল ঠিক সেই পুরোনো ডায়েরির পাতায়, যেটা মাহির একদিন তাকে দিয়েছিল।

“মাহির,
তুমি বলেছিলে, আমি বললেই তুমি অপেক্ষা করতে পারো।
আজ বলছি—আমি এখনও বিশ্বাস করি।
আমি আসছি তোমার খোঁজে।
যদি পাও, একবার তাকিও আমার চোখের দিকে।
দেখবে—তোমার অপেক্ষার দাম আমি দিতে এসেছি।”

পরদিন ভোরে, ব্যাগে শুধু কয়েকটা কাপড়, আর হাতে সেই চিঠি, আয়াত বের হয়ে গেল। উদ্দেশ্য ঠিক নেই। শুধু জানে, মাহিরের স্বপ্ন ছিল একটা ছোট বইয়ের ঘর, শহরের কোলাহল ছেড়ে।

দুই দিন পর, ঠাকুরগাঁওয়ের এক ছোট লাইব্রেরিতে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ায়। বোর্ডে লেখা:
"তালপাতার ঘ্রাণ – বইয়ের ঘর, গল্পের স্বপ্ন।"

এক কোণে বসে থাকা এক শান্ত মানুষ। চোখে রোদচশমা, চুল কিছুটা পাকা, কিন্তু সেই হাসিটা একটুও বদলায়নি।
মাহির তাকায়। আয়াত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

মাহির এগিয়ে আসে। একটুও বিস্মিত নয়, শুধু জিজ্ঞেস করে,
– “তুমি কি দেরি করেছো?”
আয়াত বলল,
– “হয়তো… কিন্তু এসেছি, এটুকুই কি যথেষ্ট না?”

মাহির হাসল। সেই পুরোনো ডায়েরিটা টেনে এনে একটা পৃষ্ঠা খুলে দেখাল:
“মিলন হবে কতদিনে?”
তার নিচে ছোট করে লেখা:
“যেদিন সে নিজে আসবে, আমার কোনো না বলা প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।”

দুইজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
আকাশে হালকা মেঘ, সূর্য উঁকি মারছে।
আর পৃথিবীর এক কোণে দাঁড়িয়ে এক অসম প্রেমের জয়গান গাইছে—নিঃশব্দে।
40 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: