পল্লীকবি জসীম উদ্দীন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
মাটির গন্ধ আর নদীর কলতানে ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম।
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার পাশেই আজকের বাংলাদেশের ফকিরহাট।
সেই গ্রামেই ১৮৯৯ সালের ১লা জানুয়ারি জন্ম নেয় এক শিশু—
যার নাম ছিল মোজাম্মেল হক।
কিন্তু আজকের বাংলা সাহিত্য-জগতে তাকে সবাই চেনে তার অসাধারণ কবিতা আর গ্রামবাংলার মায়াবী ভাষার জন্য — জসীম উদ্দিন নামে।

ছোটবেলা থেকেই মোজাম্মেল ছিল অন্যরকম।
মাঠ-ঘাটের মাটির গন্ধে সে যেন পরিপূর্ণ,
গ্রামের ছোট ছোট কাহিনী শুনে তার মন মুগ্ধ হতো।
সে একদিকে খেলা করত, হাঁস-মুরগি পালত,
অন্যদিকে বসত ঘরের পাশে বসে বড়দের কথা শোনত—
যেখানে ছিল গল্প মানুষ, ভালোবাসা, কষ্ট আর স্বপ্নের সুর।

তার বাবা কাজী আব্দুল হাকিম ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি।
পরিবার আর্থিক দিক থেকে খুব সমৃদ্ধ না হলেও,
বাড়ির পরিবেশ ছিল শিক্ষাবান্ধব।
মায়ের কোলে বড় হয়ে মোজাম্মেলের চোখে পড়ত সেই গ্রামের প্রকৃতির রূপ—
সবুজ ধানক্ষেত, পাখির কলরব, পুকুরের জলধারা—
এই সবই ছিল তার সুর, তার কবিতা গড়ার ভিত্তি।

স্কুলের জীবন শুরু হয়েছিল ছোট গ্রামেই,
কিন্তু মোজাম্মেলের মন চেয়েছিল বড় কিছু শেখার।
শিক্ষকরা তাকে বুঝতে পারতেন তার কাব্যময় মনটাকে।
তারা বলতেন, “মোজাম্মেল, তুমি লেখো, তোমার ভাষা সবার থেকে আলাদা।
তুমি গ্রামের মানুষকে গানের মত বর্ণনা করো।”

শিক্ষাবৃত্তি পেতে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।
ঢাকার পাটুয়ালি মাদ্রাসায় ভর্তি হন,
যেখানে শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃত, ফারসি, আর আরবি ভাষা শিখেন।
তারপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন,
তবে জীবন তাকে অন্য পথে নিয়ে যায়।

তার কবিতা লেখা শুরু হয় তখনই,
যখন তার চারপাশে মানুষ কষ্টে থাকে।
বিশ্বযুদ্ধের ত্রাস, ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়,
গ্রামের গরীব মানুষের জীবন—
এসব থেকেই উঠে আসে তার কবিতার ভিত্তি।

তার প্রথম পরিচিতি পায় ১৯২০ সালের দিকে,
যখন তার কবিতা শুরু হয় স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ পেতে।
তার ভাষা ছিল সরল কিন্তু গভীর,
যেখানে মাটির গন্ধ ছিল,
আর মানুষের জীবনের খাঁটি অনুভূতি জড়িয়ে ছিল।

জসীম উদ্দিন কখনো নিজেকে শুধু একজন কবি মনে করেননি।
তার মতে, কবিতা হলো মানুষের জীবনের আয়না।
সে লিখেছেন গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট,
তাদের স্বপ্ন, তাদের ভালোবাসার কথা।

একটি বিখ্যাত কবিতা “কোথায় আছো রে ঘুম?” তার লেখনীয়ের উজ্জ্বল নিদর্শন।
এখানে তিনি দেখিয়েছেন মানুষের মানসিক অবস্থা,
যারা দুনিয়ার কষ্টে বঞ্চিত,
তারা ঘুম পায় না, শান্তি পায় না।

তার আরেকটি মহাকাব্য ছিল “দোলায় নাচরত মানুষ”,
যেখানে তিনি গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে তুলে ধরেছেন
অবশেষে যেখানে জীবন আর মৃত্যু এক হয়ে গেছে একরকম।

তাঁর কবিতায় ছিল এক গভীর মানবতাবাদ,
একটা সামাজিক সচেতনতা।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“কবি যদি সমাজের ব্যথা বুঝতে না পারে, সে কবি নয়।”

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার অনেক সংগ্রাম ছিল।
ব্রিটিশ শাসন তার লেখা দমন করত,
অনেকবার তার বই বাজেয়াপ্ত হয়,
তবুও তিনি থেমে যাননি।
সে সময় তার কবিতা ছিল বিপ্লবের ভাষা।

তাঁর গানগুলো—যেমন “মন যেথায় যেথায়”, “মেঘনায় বৃষ্টি পড়ে”—
সেগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
বাংলার মানুষ তার কবিতাকে ভালোবেসে,
যেমন ভালোবাসে নিজ দেশের মাটিকে।

জসীম উদ্দিন কখনোই ছিলেন কেবল কবি নন।
তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, এক আবৃত্তিকার, এক সমাজসেবক।
বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অনন্য।

তবে ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে তার স্বাস্থ্যে সমস্যা দেখা দেয়।
অতিরিক্ত পরিশ্রম ও মানসিক চাপ তাকে ক্লান্ত করে তোলে।
তার কিছু বই লিখে যেতে না পারলেও,
তার লেখা তখনো মানুষের মনে জ্বলছে অমলিন আগুনের মত।

১৯৭৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন,
ঢাকায়, যেখান থেকে আজকের বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে।
তার মৃত্যুর পরেও তার কবিতা বেঁচে থাকে,
মাটির মতো গন্ধ এনে দেয় ভালোবাসা আর মানবতার।

আজকের দিনে যখন কেউ বাংলা সাহিত্যের কথা বলে,
তার নাম সবার আগে আসে।
কারণ তিনি বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন প্রাণ,
গ্রামের মানুষের কষ্টকে দিয়েছেন শব্দ।

তাঁর কবিতার প্রতিটি লাইন আমাদের শেখায়—
যে মাটি থেকে আমরা এসেছি, সেই মাটির গন্ধ আমাদের ভেতরেই।
যে মানুষগুলো আমাদের আশেপাশে থাকে, তাদের সুখ-দুঃখ বুঝতে হবে।
27 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: