কাঞ্চনজঙ্ঘা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সকাল ৬টা।
পঞ্চগড়ের ঠান্ডা বাতাসে কুয়াশা এখনো জমে আছে।
আর দূরে—অনেক দূরে হিমালয়ের শিখরে,
হালকা সূর্যের আলো পড়তেই উঁকি দেয় সেই স্বপ্নের দৃশ্য—
কাঞ্চনজঙ্ঘা।

হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার নাম রায়হান আহমেদ।
ঢাকা থেকে এসেছে কয়েক দিনের ছুটিতে।
নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নিতে, নিজের ভাবনাগুলো পরিষ্কার করতে।

কিন্তু সে একা আসে নি।
তাঁর সঙ্গে এসেছে একজন, যে তার মনের মধ্যেই বাস করে।
নাম সালমা বিনতে ইমতিয়াজ।
রায়হানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, এক সময়ের খুব কাছের মানুষ।

তবে আজ তারা বন্ধু নয়, প্রেমিকাও নয়।
তারা শুধু ‘একসাথে আসা দুটি দূরের গল্প’।


---

এই সফরের শুরু হয়েছিল এক ফোনকল দিয়ে।

– “তুমি পঞ্চগড় যেতে চেয়েছিলে, মনে আছে?”
– “হ্যাঁ... সেই সময় তো বলেছিলে একদিন না একদিন যাবো।”
– “তো চলো, যাই। এবার আর দেরি না করি।”

রায়হান ভেবেছিল, এটা হয়তো কোনো হঠাৎ আবেগ, হয়তো একবার দেখা হয়ে গেলে, কিছু গুছিয়ে নেওয়া যাবে।
কিন্তু ট্রেনের জানালার পাশে বসে থাকা সালমার চোখ দুটো ছিল নীরব।
তাতে না ছিল অভিমান, না ছিল ভালোবাসা—
ছিল শুধু এক গাঢ় স্তব্ধতা।


---

পঞ্চগড় পৌঁছে প্রথম রাত তারা কাটায় ‘তেঁতুলিয়া’র এক পাহাড়ঘেঁষা রিসোর্টে।
সেখানে গিয়েই প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা বলে ওঠে রায়হান—

“দেখো সালমা, দূরে শ্বেতশুভ্র যে পাহাড়টা—
ওটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা।
বাংলাদেশের মাটি থেকে দেখা সেই স্বপ্নের শিখর।”

সালমা তাকায়।
তার চোখেও ঝিকিমিকি আলো পড়ে, কিন্তু সে বলে না কিছুই।


---

রাতের দিকে আগুন জ্বালানো হয়।
চারপাশে বন-বনানী, নিচে নরম মাটি, আর মাথার ওপরে হাজার তারার মেলা।
রায়হান একটু হেসে বলে,
“এই জায়গাটায় এসে... মনে হচ্ছে, আমরা যদি কখনো একসাথে থাকতাম, এমন জায়গায়ই আসতাম ঘুরতে।”

সালমা এবার চুপ করে থাকে না।
সে সোজা তাকায় রায়হানের দিকে,
“আমরা একসাথে থাকার জন্য কিছুই করিনি, রায়হান।
আমরা শুধু কল্পনায় একটা সুন্দর গল্প তৈরি করেছিলাম।
বাস্তবে তার একটা পাতাও লিখিনি।”

এই কথায় হঠাৎ যেন আগুনের আলো একটু কমে আসে।
হাওয়াটা একটু কষ্ট নিয়ে বয়ে যায়।

রায়হান ধীরে বলে,
“তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবাসোনি?”

সালমা চোখ সরিয়ে নেয়,
“ভালোবাসা তো অনেকভাবে আসে।
তোমার চাওয়া ছিল আগলে রাখা।
আমার চাওয়া ছিল, নিজেকে খুঁজে পাওয়া।
আমরা কখনো বুঝিনি, মাঝখানের এই দূরত্বটা কি।”

রায়হান মাথা নিচু করে ফেলে।
হঠাৎ তার মনেও একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বইমেলা, যেখানে প্রথম সালমাকে হাত ধরে বলেছিল,
“তুমি ছাড়া কিছু কল্পনাই করি না।”

আর সালমা হেসে বলেছিল,
“তখন বুঝি না, এখন বুঝি—কেউ একজনকে ভালোবাসলেও, সে ভালোবাসা আমাদের মিলায় না।”


---

পরদিন ভোর।
৬টা বেজে ২০ মিনিট।
পাহাড় ঘেরা বারান্দা।
সামনের আকাশে হালকা লাল আভা।

রায়হান আর সালমা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
মেঘের নিচে ঝকঝকে সাদা বরফে মোড়ানো কাঞ্চনজঙ্ঘা-র দৃশ্য পুরোপুরি চোখের সামনে ফুটে উঠেছে।

সালমা ধীরে বলে,
“তুমি জানো রায়হান, এই পাহাড়টা অনেকটা ভালোবাসার মতো।
দূর থেকে দেখলে লাগে কাছে,
কিন্তু যতই কাছে যেতে চাও, বুঝো, সেটা ধরার নয়।”

রায়হান পাশে তাকায় না, শুধু বলে,
“তাহলে আমরা কেন এলাম?”

সালমা এবার হেসে বলে,
“কারণ কিছু দৃশ্য কাছ থেকে দেখা যায় না,
তবে একবার চোখে পড়লে, সারাজীবন মনে থাকে।
তুমি আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা রায়হান—ধরতে পারিনি, তবু ভুলতেও পারিনি।”

একটু চুপ থেকে বলে,
“আমার বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে জানো।
পরশু, কুড়িগ্রামে।
তোমাকে জানাতে চেয়েছিলাম—এই সফরটাই সেই চিঠি।”

রায়হান এবার সালমার দিকে তাকায়।
তার চোখে জল নেই, অভিমান নেই।
শুধু নির্জন কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া পড়ে আছে সেগুলোয়।

সে শুধু ফিসফিস করে বলে,
“ভালো থেকো, সালমা।
তুমি যদি খুশি থাকো, আমি সেই খুশিকে ভালোবেসে যাবো।”


---

শেষ দিন
রায়হান একা দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার পাশে কেউ নেই,
তবু মনে হয়—একটা গল্প শেষ হয়নি,
শুধু এক অন্যরকম পাতায় লেখা হচ্ছে এখন।

হয়তো কোনোদিন, কোনো আকাশের নিচে,
এই পাহাড় আবার দেখাবে তাকে কোনো নতুন ভালোবাসার ছায়া—
কিন্তু সালমা?
সে থাকবে শুধুই তার গল্পে,
একটি কল্পনার কাঞ্চনজঙ্ঘা হয়ে।
33 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: