বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় যাওয়া মানেই যেন একটা সময়ের দরজা খুলে ফেলা। আধুনিকতার আড়ালে ঢেকে রাখা ঐতিহ্যের শহর, যেখানে রিকশার ঘণ্টা, মিষ্টির ঘ্রাণ আর ট্রামের ধীরে চলা গতিতে শহরটা যেন আপনাকে পুরোনো দিনের গল্প শোনায়।
আমার এই সফরটা ছিল একেবারেই হঠাৎ। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল কলকাতায় একবার যাই, কারণ বাবা বলতেন—“কলকাতা এক সময় আমাদেরই ছিল, ঐতিহ্যটুকু আজও বহন করে যায়।”
সেই টান থেকেই এবারের পাসপোর্ট হাতে পেতেই তৈরি হয়ে নিলাম। গন্তব্য—কলকাতা।
---
যাত্রা শুরু
ঢাকা থেকে বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বাসে যাওয়া যায় খুব সহজে। আমি বেছে নিলাম “Shohagh Paribahan”-এর এসি বাস। রাত দশটায় বাস ছাড়ে গাবতলী থেকে। বাসে উঠে মনে হলো, অনেকেই আমার মতোই ‘প্রথম কলকাতা’ ট্যুরে যাচ্ছেন।
ভোরে যখন পৌঁছলাম বেনাপোল, তখন আকাশে হালকা আলো। সীমান্ত পারাপারের কাজটা একটু সময়সাপেক্ষ, কিন্তু চমৎকারভাবে সব ফর্মালিটি শেষে ভারতীয় ইমিগ্রেশন দিয়ে প্রবেশ করলাম পেট্রাপোল-এ। সেখান থেকে শেয়ার ট্যাক্সি কিংবা ট্রেনে যাওয়া যায় কলকাতা পর্যন্ত। আমি নিলাম একটি প্রাইভেট ট্যাক্সি, কারণ জানালার ধারে বসে রাস্তাঘাট, মানুষ, দোকানপাট দেখার মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ আছে।
প্রথম কলকাতায় ঢোকার মুহূর্তটা আজও মনে আছে—বড় বড় বিলবোর্ড, হলুদ ট্যাক্সি, রাস্তার পাশে বইয়ের দোকান, আর দূরে হাওড়া ব্রিজের ছায়া। মনে হচ্ছিল, কোনো পুরোনো বাংলা সিনেমার দৃশ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
---
থাকার ব্যবস্থা
আমি ময়দান মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেল বেছে নিয়েছিলাম—Hotel The Corporate। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ এবং মেট্রোস্টেশনের একদম পাশে। কলকাতায় মেট্রো সার্ভিস খুবই কার্যকর, যেকোনো জায়গায় খুব কম খরচে সহজে যাওয়া যায়।
---
প্রথম দিন: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলেজ স্ট্রিট, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল—একটা সাদা মার্বেলের বিশাল ভবন, আর তার সামনে ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠ।
সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ইতিহাস আমার চারপাশে ঘুরছে।
ভিতরে ঢুকে বুঝলাম, শুধু রাজকীয় সৌন্দর্য নয়, ভারতের ঐতিহাসিক সব সংগ্রহের এক বিশাল ভাণ্ডার এটা।
সেখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়কার চিঠি, যুদ্ধের অস্ত্র, ব্রিটিশ আমলের হস্তলিখিত নথি—সব কিছু দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ইতিহাস বইয়ের পাতাগুলো একে একে খুলে যাচ্ছে।
এরপর মেট্রো ধরে পৌঁছে গেলাম কলেজ স্ট্রিট। এটা শুধু বইয়ের বাজার নয়, এটা বইপ্রেমীদের তীর্থস্থান। নতুন পুরোনো বইয়ের গন্ধ, রাস্তার পাশে গাদা গাদা বইয়ের স্তূপ, আর মাঝখানে এক কাপ কফি হাউজের কফি—এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
সন্ধ্যার দিকে গেলাম ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। এত বড় আর এত সমৃদ্ধ মিউজিয়াম আমি আগে দেখিনি। প্রাচীন মমি, ডাইনোসরের কঙ্কাল, নানা ধরনের পাথরের গঠন—ঘন্টার পর ঘন্টা গিয়েও শেষ করতে পারিনি পুরোটা।
---
দ্বিতীয় দিন: দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট মন্দির, হাওড়া ব্রিজ
দ্বিতীয় দিন শুরু করলাম দক্ষিণেশ্বর মন্দির দিয়ে।
গঙ্গার তীরে এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, সংস্কৃতির প্রতীক। সেখানে পৌঁছে মনে হলো, কলকাতা এখনও তার শিকড় ধরে রেখেছে।
সেখান থেকে নৌকায় করে গেলাম গঙ্গা পার হয়ে কালীঘাট মন্দির। যে ইতিহাসের ওপর কলকাতা গড়ে উঠেছে, সেই কালীমার মন্দিরটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না—কতটা শক্তি আর আবেগে মানুষ এখানে আসে।
বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম হাওড়া ব্রিজ-এর কাছে।
গোধূলি আলোয় সেই ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়াচিত্র মনে হলো। হাওড়া ব্রিজ শুধু ব্রিজ নয়, এটা কলকাতার হৃদপিণ্ড।
---
তৃতীয় দিন: নিউ টাউন, সায়েন্স সিটি, ইকো পার্ক
এই দিনটা রেখেছিলাম আধুনিক কলকাতার জন্য।
নিউ টাউন অঞ্চলটা একদম আধুনিক।
গেলাম সায়েন্স সিটি—যেখানে বিজ্ঞানের খেলায় হারিয়ে গেলাম ঘন্টার পর ঘন্টা।
তারপর বিকেলে গেলাম ইকো পার্ক—বড়ো একটা এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে নানা থিমে সাজানো পার্ক, যেখানে রয়েছে মিনি বিশ্বভ্রমণ, ঝুলন্ত বাগান, জলবিল আর মিউজিক্যাল ফাউন্টেন।
সন্ধ্যার পর আলোর খেলা দেখে মনে হয়েছিল, সত্যিই এটা এক 'ইকো-ম্যাজিক'!
---
চতুর্থ দিন: টিপু সুলতান মসজিদ — ইতিহাস ও আত্মার ছোঁয়া
কলকাতা শহরের ধর্মীয় বহুত্বতার মধ্যে যেটা আমার হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে, সেটা হলো টিপু সুলতান মসজিদ।
ভিক্টোরিয়া থেকে ফেরার পথে রিকশাওয়ালার মুখে প্রথম শুনি এর নাম—
“ভাইজান, এসপ্ল্যানেডে নামেন? ঐখানে টিপু সুলতানের মসজিদ আছে, খুব সুন্দর।”
আসলেই সুন্দর!
সেই দিনে যখন সূর্য একটু পশ্চিমে ঢলে পড়ছে, আমি হেঁটে গেলাম ধর্মতলা মোড় এর দিকে। আর তার মাঝখানে চোখে পড়ে এক অনবদ্য স্থাপত্য—সাদা মার্বেলের গম্বুজ, সবুজ মিনার, আর সেই ইতিহাসের নিঃশব্দ প্রতীক—টিপু সুলতান শাহী মসজিদ।
এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন প্রিন্স গোলাম মুহিউদ্দিন, যিনি ছিলেন মহারাজা টিপু সুলতানের পুত্র। এটি ১৮৪২ সালে নির্মিত, কিন্তু তার সৌন্দর্য আজও মন কাড়ে।
মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আমার প্রথম অনুভূতিই ছিল—
এ যেন একটা চুপচাপ ইতিহাসের চিৎকার।
আমি ভেতরে প্রবেশ করি নামাজের সময়।
ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন সারা শরীর জড়িয়ে ধরে।
নামাজে দাঁড়ানো মুসল্লিরা যেমন নীরব, তেমনি যেন শহরের কোলাহলও গায়েব হয়ে যায় এই প্রাচীন প্রাঙ্গণে।
দেয়ালে খোদাই করা কোরআনের আয়াত, ঠান্ডা মার্বেলের মেঝে, আর গম্বুজের নিচে বাতাসে মিশে থাকা আজানের ধ্বনি—সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ, যেন আত্মা শান্ত হয়ে যায়।
আমি সেখানে আসর এর নামাজ আদায় করি।
নামাজ শেষে হেলান দিয়ে বসে থাকি দেয়ালের পাশে।
হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক এসে বসেন আমার পাশে। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা, মুখে লাল রঙের দাঁড়ি।
তিনি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করেন,
“বাংলাদেশ থেকে?”
আমি অবাক হয়ে বলি, “জ্বী, বুঝলেন কী করে?”
“তোমার চোখে কেমন যেন দূরের ক্লান্তি আছে। তা তো শুধু সফরের নয়, দেশের টানেরও।”
তারপর তিনি আমার হাতে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি ধরিয়ে দিয়ে বলেন,
“এই মসজিদে যে আসে, আল্লাহ তার জন্য কিছু না কিছু রেখে দেন। হয় শান্তি, নয় উত্তর।”
আমি মাথা নিচু করে হাসি। হয়তো আমার এই সফরের সেরা কথা ছিল ওই কথাটাই।
---
কলকাতার খাবার
এতসব দেখার মাঝেও এক জিনিস ভুলিনি—খাওয়া!
কলকাতায় খাবার একেকটা স্বাদ একেকটা গল্প।
ফ্লুরিজ, অরুন্ধতী’স কিচেন, ভোজন শালা, ভেমলি’স কেবাবস—সবখানে গিয়েছি।
আর মিষ্টি?
রসগোল্লা, মিষ্টি দই, সন্দেশ, কামান্দি, ছানার জিলিপি—যা খেয়েছি, মনে হচ্ছিল একেকটা ভাগ্যলিপি!
---
বিদায় বেলা
চার রাত তিন দিনের এই সফরটা চোখের পলকে কেটে গেল।
ফিরতি পথে ট্রেনে বসে মনে হচ্ছিল, কত কিছু দেখা হলো—তবু যেন কত কিছু বাকি।
কলকাতা আপন করে নেয়, আবার বিদায় জানায় নিজস্ব ছন্দে।
বাংলাদেশ থেকে খুব সহজেই কলকাতায় যাওয়া যায়, কিন্তু ফিরে আসা হয় না হৃদয় থেকে।
একটা অংশ রয়ে যায় ওখানেই, হয়তো হাওড়া ব্রিজের নিচে, কলেজ স্ট্রিটের কোনো এক পুরোনো বইয়ের পাতায়, কিংবা টিপু সুলতান মসজিদের ঠান্ডা মার্বেলের এক কোণে।
সমাপ্ত................................
ঘুরে এলাম কলকাতা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
36
Views
4
Likes
0
Comments
0.0
Rating