এই মন তোমাকে দিলাম

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ছেলেটার নাম রাফিদ। বয়স পঁচিশের মতো। দেখতে একেবারে সাধারণ, আচরণেও তেমন কোনো আলাদা কিছু নেই। তবে তার চোখে ছিল একধরনের গভীরতা—যেটা একবার দেখলে আর ভুলতে পারো না।

আর মেয়েটার নাম নাইলা হুসাইন।
স্বভাবে সাহসী, চিন্তায় প্রগাঢ়, আর মুখের ভাষায় একরকমের ঠাণ্ডা যুক্তি।
সে ছিল একেবারে ভিন্ন ঘরানার মেয়ে—তাকিয়ে থাকা নয়, জবাব দেওয়ার মানুষ।

তাদের পরিচয় হয় এক ট্রেন জার্নিতে।
সুবর্ণ এক্সপ্রেস, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম।
দুজন পাশাপাশি সিটে বসেছিল।
নাইলা তখন একটি গল্পের বই পড়ছিল—“ভালোবাসার ক্যানভাস”।
একটা ঝাঁকুনি আসতেই বইটা নিচে পড়ে যায়।

রাফিদ বইটা তুলে দেয়।
“বই পড়তে পড়তে কোথায় চলে যাচ্ছিলে?”
নাইলা একটু তাকিয়ে হেসে বলে,
“তুমি কি সব মেয়েকেই এমন প্রশ্ন করো?”

রাফিদ হেসে মাথা নাড়ে।
“না, সবাই তো এমন করে পড়েও না।”

এই কথোপকথনের শুরুটা ছিল খুবই হালকা।
কিন্তু বাকি রাস্তাটা কেমন যেন ওরা একে অপরকে চেনার চেষ্টা করতেই কাটিয়ে দেয়।
রাফিদ আর্কিটেকচার পড়ে, ছবি আঁকে, নিজের মতো স্বপ্ন দেখে।
আর নাইলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রী—বিশ্ব রাজনীতি তার নখদর্পণে, কিন্তু নিজের মনের রাজনীতি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

স্টেশনে নেমে যাওয়ার সময় রাফিদ বলেছিল,
“আবার দেখা হবে, তাই না?”
নাইলা একটু হেসে বলে,
“জানি না। তবে তোমার মতো কেউ মনে রাখার মতো।”

তিন মাস পর
নাইলা বসে ছিল নীলক্ষেতের পাশে একটা ক্যাফেতে, একা।
একটা আর্ট এক্সিবিশনের প্রস্তুতির কাজে সে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছিল।
হঠাৎ একপাশ থেকে গলা—
“এই চেয়ারটা খালি?”

নাইলা চোখ তুলে দেখে,
রাফিদ।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে যায়।

“তুমি এখানে?”
“তুমি যে আবার দেখার সুযোগ দেবে, জানতাম না।”

ওরা হেসে ফেলে।
এই হাসির মধ্যেই শুরু হয় এক নতুন পথচলা।
সপ্তাহে একদিন দেখা, গল্প, একসঙ্গে কফি, আর খুব স্বাভাবিকভাবে—
একটুখানি ভালোবাসা জমে ওঠে না বলা ভাষায়।

রাফিদ একদিন নাইলার হাতে একটা ছোট নোট লিখে দেয়—
“এই মন তোমাকে দিলাম। যত্নে রেখো।”

নাইলা সেটা পড়ে, কিছুই বলে না।
শুধু চুপ করে, চোখ নামিয়ে ফেলে।
তার ভেতরে তখন ঝড় বইছে—
সে কি পারবে আবার কাউকে বিশ্বাস করতে?

কারণ নাইলার অতীতে ছিল এক হারিয়ে যাওয়া মানুষ।
ওমর—যে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অন্য কারো জন্য, বিনা শব্দে, বিনা ব্যাখ্যায়।
নাইলা বিশ্বাস করতে শিখেছিল—
ভালোবাসা মানে, হঠাৎ ভেঙে যাওয়া।

তবু, রাফিদের চোখের ভেতরে একটা শান্তি ছিল।
সে কোনো দাবি করে না, তাড়া দেয় না।
শুধু পাশে থেকে যায়।

ছয় মাস পর
রাফিদ তার ছবি আঁকার এক্সিবিশনে নাইলাকে ডাকে।
প্রদর্শনীর এক দেয়ালে বড় করে আঁকা নাইলার মুখ—
চোখ বোজা, ঠোঁটে অর্ধেক হাসি, নিচে লেখা—
“এই মন তোমাকে দিলাম”

নাইলা ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলে।
এতদিনের জমানো সব প্রশ্ন, সংশয়, ভয়—
সব ভিজে যায় চোখের জলে।

সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফিদের দিকে তাকায়,
চুপচাপ গিয়ে বলে—
“তোমার মন যত্নে রাখার চেষ্টা করবো। তবে আমিও একটা মন দিচ্ছি—আশা করি, রাখবে?”

রাফিদ হেসে হাত বাড়িয়ে বলে,
“তোমার মনটাই তো আমার ক্যানভাস।”

সেদিনের পর থেকে,
নাইলা আর রাফিদ একসঙ্গে গল্প লেখে,
নতুন রঙে, নতুন আলোতে।

কারণ ভালোবাসা মানেই তো—
একজন কাউকে মনের দায়িত্ব দেওয়া,
আর আরেকজন সেই দায়িত্ব বুঝে নেয়ার সাহস দেখানো।
35 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: