সবার জীবনে একটা গল্প থাকে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সবার জীবনে একটা গল্প থাকে। কারওটা উচ্চস্বরে বলা যায়, কারওটা চুপিচুপি চোখের জল গড়িয়ে বলে ফেলে, কারওটা কেবল বুকের ভেতরে জমে থাকে চিরকাল। কারও গল্প শুরু হয় ভালোবাসায়, শেষ হয় প্রতারণায়। আবার কেউ প্রতারণা দিয়ে শুরু করে ভালোবাসা দিয়ে শেষ করে দেয় এক জীবন।

তিথি’র গল্পটা ঠিক কোনটার মতো?

রাজধানীর এক চুপচাপ গলিতে দুই রুমের ছোট্ট বাসা। ডান পাশে একটা টেবিল, বইয়ের গাদায় ঢাকা। বাঁ পাশে ছোট্ট খাট, একটা নীল কভার, যার এক কোনা ভাঁজ হয়ে থাকে সবসময়। মেয়েটা একা থাকে এখানে। নাম—তিথি ইসলাম।

জীবনের একটা সময় ছিল, যখন বাসার খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আকাশের তারা গুনত সে। এখন আর গুনে না। এখন সময় কাটে ওয়ার্ড ডকুমেন্টের সাদা পৃষ্ঠায় শব্দ সাজিয়ে। পেশায় একজন চিত্রনাট্যকার, কিন্তু নিজের জীবনের স্ক্রিপ্টটাই যেন এলোমেলো হয়ে গেছে বহু আগে।

তিথির গল্প শুরু হয়েছিল রায়হান নামের এক ছেলেকে দিয়ে।
নরম গলার, গভীর চোখের, অদ্ভুত রকম শান্ত একটা ছেলে।
পরিচয় হয়েছিল অনলাইনে, কথায় কথায় গভীরতা এসেছিল এতটাই যে মনে হয়েছিল—এটাই বুঝি প্রেম।

প্রথম দেখার দিনটা এখনো মনে আছে তিথির। ধানমণ্ডি লেকের পাশে বসে ছিল দু’জন। হঠাৎ রায়হান বলেছিল,
“তিথি, তুমি জানো? সবার জীবনে একটা গল্প থাকে। আমি চাই, আমার গল্পটা তুমি হও।”

তিথি সেই দিন চুপ করেই ছিল। কারণ তার বুকের ভিতরে অন্য একটা গল্প বুনে চলেছিল। সেই গল্পে ভয় ছিল, দুঃখ ছিল, বিশ্বাসভঙ্গের অভিজ্ঞতা ছিল।

তারপরও শুরু হয়েছিল একটা সম্পর্ক।
তিথির মুখে হাসি এসেছিল, ঘুমের ভেতর রায়হানের নাম ফিসফিস করত সে।
রায়হান জানত তিথি কফিতে দু চামচ চিনি খায়, তিথি জানত রায়হান ঝড়ের দিনে রেইনকোট না পড়ে ভিজে হাঁটতে ভালোবাসে।

কিন্তু সব গল্পে যেমন টুইস্ট আসে, তেমনই এল একদিন।

তিথি একদিন হঠাৎ ফোন করে জানতে পারে—
রায়হান ব্যস্ত, কথা বলতে পারবে না।
তিনদিন, চারদিন—একই উত্তর।
পরে হঠাৎ একদিন রায়হানের স্টোরিতে সে দেখে,
এক মেয়ের সঙ্গে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছবি।
ক্যাপশন—
“She said yes.”

তিথির বুকের মধ্যে কিছু একটা চুপচাপ চিড় ধরে যায়।
তিথি তখন প্রশ্ন করে না, ঝগড়া করে না।
শুধু ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখে, চোখের জল মোছে হাতের আঙুল দিয়ে, আর বলে—
“সবার জীবনে একটা গল্প থাকে… আমারটা এখানেই শেষ।”

তারপর কেটে গেছে তিনটা বছর।
তিথি এখন আর কান্না করে না।
শুধু মাঝে মাঝে ডায়রির একটা পাতায় লিখে রাখে—
“একটা গল্প শেষ হয়ে গেলে নতুন গল্প শুরু হয়।”

এভাবেই শুরু হয়েছিল তানভীর নামের ছেলেটার সঙ্গে পরিচয়।
একটা স্ক্রিপ্ট রাইটিং ওয়ার্কশপে তানভীর ছিল ইন্সট্রাক্টর, তিথি ছিল অংশগ্রহণকারী।
তানভীর বলত কম, হাসত বেশি। তিথির গল্প শুনত, কমেন্ট করত না।
তিথি প্রথমে বিরক্ত হত—
“তুমি আমার গল্প শুনে কিছু বলো না কেন?”
তানভীর শুধু বলত,
“কারো গল্পের মাঝে কথা বলা ঠিক না।”

এই একটা লাইনই তিথির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল।
তিথি আবার লিখতে শুরু করেছিল নতুন করে।
এবার সে লিখছিল এমন একজনকে নিয়ে, যে কাঁদিয়ে যায় না—থেকে যায় চুপচাপ।

একদিন সন্ধ্যায় তানভীর তিথিকে জিজ্ঞেস করে বসে—
“তোমার গল্পটা কীভাবে শেষ হবে?”

তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
“যেমনভাবে শেষ হয়—আলো নিভে গেলে, রোদের অপেক্ষা থাকে। ঠিক তেমন।”

তানভীর হেসে বলে,
“তোমার গল্পে আমি থাকি?”
তিথি চোখ নামিয়ে বলে,
“তুমি যদি যেতে না চাও, তাহলে থাকতে পারো।”

তিথির গল্পটা এখান থেকেই বদলে যায়।
এই গল্পে কেউ পালিয়ে যায় না।
এই গল্পে কেউ হঠাৎ করে বলে না—"She said yes"।
এই গল্পে কেউ ফোন সাইলেন্ট করে রাখে না, বরং বলেই ফেলে—
“তোমার কণ্ঠটা না শুনলে মনে হয় দিনটাই অপূর্ণ রয়ে গেল।”

তিথি আজকাল অফিস থেকে ফিরলে কলিংবেলে শব্দ হয়, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে তানভীর।
হাতে কখনও মোমফুল, কখনও বই।
তিথির খালি দেয়ালে ছবির ফ্রেম ঝোলে—তানভীর ক্যামেরায় তোলা ক্যাম্পাসের কিছু দৃশ্য।

তিথি এখন আর ঘরের জানালা দিয়ে তারা গোনে না।
সে রোজ নিজের আয়নায় তাকায়, নিজেকে ভালোবাসে।

কারণ সে বুঝেছে—
সবার জীবনে একটা গল্প থাকে।
কারওটা শেষ হয়ে গিয়ে শুরু হয় আবার,
আর কারওটা… ঠিক সময়েই আসে, বুকের ঠিক ডান পাশে একটা স্থায়ী ঘর বানিয়ে।
35 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: