কানামাছি

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার ধূসর আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটার চোখে একরাশ বিষণ্ণতা। নাম তার তিথি। খুব সাদামাটা এক মেয়ে, পড়াশোনায় বেশ ভালো, কিন্তু জীবনের খেলায় বারবার হেরে যাওয়াটাই যেন তার নিয়তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। চার বছর ধরে একটাই ছেলেকে ভালোবাসে—সাদিক।

তাদের পরিচয় হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, যেখানে তিথি একা দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাম্পাসের ‘ক্যাফে রোজ’-এর পাশে। হঠাৎ ছেলেটি এগিয়ে এসে বলেছিল—

“আপনি কি হারিয়ে গেছেন?”
তিথি হেসে বলেছিল, “আমার মনটাই হারিয়েছে, আমি না।”

সেই একটুকু কথাতেই শুরু হয়েছিল এক কানামাছি খেলা। চোখ বেঁধে একজন খোঁজে, আর একজন পালিয়ে বেড়ায়। সেই পালানো আর খোঁজার মাঝেই জন্ম নেয় ভালোবাসা।

প্রথমদিকে সাদিক খুব সাদামাটা ছেলেটা ছিল—সিগারেট খায় না, নামাজ পড়ে, ক্লাসে মনোযোগী। তবে একটা জিনিস সে খুব ভালো জানত—তিথির মন বোঝা। হোস্টেলে একা থাকা তিথির জন্য মাঝেমধ্যে সে কফি নিয়ে হাজির হতো, কিংবা রাত তিনটায় কল করে বলত,
“ঘুমাও না এখনো? তাহলে এসো, দুজন মিলে চাঁদ দেখার নাটক করি।”

তিথি হেসে বলত,
“চাঁদও তো কুয়াশায় ঢাকা থাকে এই শহরে!”

দিন গড়ায়, মাস কেটে যায়। একদিন সেই সাদিক বদলে যেতে থাকে। ফোন রিসিভ করে না, কলব্যাক দেয় না। ‘বিজি আছি’ বলে কথার ইতি টানে। তিথির মন ধুকপুক করতে থাকে। একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করে—

“তুমি কি আর আগের মতো ভালোবাসো না?”

সাদিক নির্লিপ্ত গলায় বলে—
“ভালোবাসা কি একটা জায়গায় থেমে থাকে? সময়ের সঙ্গে সব বদলায়।”

তিথি চুপ করে যায়। চোখের কোণে জমা জল আর মুখের হাসি একসঙ্গে মিশে যায় বাতাসে।

এরপর থেকে শুরু হয় এক অন্যরকম কানামাছি খেলা। সাদিক পালিয়ে বেড়ায়, তিথি খুঁজে ফেরে। মেসেঞ্জারে পাঠানো অগণিত মেসেজ, ফেসবুকে একসঙ্গে তোলা ছবিগুলো ডিলিট করা, কিংবা ডিপার্টমেন্টে একসঙ্গে থাকলেও অচেনার মতো পাশ কাটিয়ে যাওয়া—সবই সেই খেলার অংশ।

তিথির বন্ধু মীম বলেছিল,
“তোকে নিয়ে ও খেলেছে রে, এখন ছেড়ে দে ওকে।”
তিথি হেসেছিল শুধু, বলেছিল,
“যারা খেলতে খেলতেই মরে, তারা আর জিততে চায় না।”

সাড়ে তিন বছর পর
তিথি এখন খুলনার একটি এনজিওতে কাজ করে। গ্রামের পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে কাজ করে সে। তার চোখে আগের সেই জ্বলজ্বলে উচ্ছ্বাস নেই, বরং তাতে অভিজ্ঞতার ক্লান্ত ছায়া।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ সে একটা ফোন পায়। অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করতেই কণ্ঠটা বলে—
“তিথি... আমি সাদিক।”

তিথির শরীর জমে যায়।
“তুমি?”
“হ্যাঁ... অনেকদিন পর কথা বলছি। যদি দেখা করতে পারো...”

অনেকটা ভেবে সে রাজি হয়। ঠিক হয়—ঢাকার পুরোনো সেই ‘ক্যাফে রোজ’-এ দেখা হবে। তিথি বুক ধুকপুক করে সেখানে যায়। আর তখনই ঘটে ঘটনাটা।

সাদিক আসে, হাতে একটা ছোট্ট কাগজের বাক্স। মুখে একটু দাড়ি, চোখে কেমন যেন অনুশোচনার ছায়া।
“তিথি, জানি আমার কথা বলার কোনো অধিকার নেই। কিন্তু আমি জানতাম না ভালোবাসা এমন ভাবে কাঁদায়। আমি চলে গিয়েছিলাম কারণ ভয় পেয়েছিলাম—তোমার মতো ভালো একটা মেয়ে আমাকে কখনোই জীবনসঙ্গী হিসেবে দেখবে না। আমি ভেবেছিলাম, তুমি ভালো কাউকে ডিজার্ভ করো।”

তিথি হেসে বলে,
“তুমি যা চেয়েছিলে, সেটাই পেয়েছিলে। পালিয়ে গিয়ে মুক্তি। আর আমি? আমি যে প্রতিদিন চোখ বেঁধে তোমাকে খুঁজেছি, সে খেলার কী হবে?”

সাদিক মাথা নিচু করে কাগজের বাক্সটা এগিয়ে দেয়।
ভেতরে একটা ছোট্ট গিফট—একটা রাবার ব্যান্ড, তাতে খোদাই করা লেখা:
“তোমার কানামাছি, আমার চোখ বাঁধা।”

তিথি চোখ মেলে চেয়ে থাকে। হঠাৎ একটা বাচ্চা এসে বলে,
“আন্টি, তুমি কানামাছি খেলো? আমিও খেলবো!”

তিথি হাসে। মাথা নিচু করে বলে,
“আমি তো খেলেই চলেছি, এখনো। তবে আজ চোখ খুলে ফেলেছি। এখন খুঁজব না, শুধু নিজের পথেই হাঁটব।”

সাদিক পেছন থেকে বলে,
“তিথি... আমি চাই আবার খেলাটা শুরু হোক। এইবার আমি চোখ বেঁধে থাকব, তুমি খুঁজে নিও।”

তিথি বলে,
“এতদিন পরে খেলা শুরু হয় না সাদিক। কেউ যদি খেলতে চায়, তাকে শুরুতেই থাকতে হয়। এখন আর কেউ অপেক্ষা করে না।”

সেদিন সন্ধ্যায় তিথি হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, জীবনটা আসলে এক দীর্ঘ কানামাছি খেলা।
কারো চোখ বাঁধা, কারো মন।
কারো ভালোবাসা লুকোচুরি খেলে,
আর কারোটা চিরকাল নিঃশব্দে খুঁজে ফেরে।

তবে শেষ পর্যন্ত কিছু মানুষ খুঁজে পায়।
আর কিছু মানুষ, চিরকাল শুধু খেলতেই থাকে...
39 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: