এক ফোঁটা পানি

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

পানির বোতলটা প্রায় খালি হয়ে গেছে। তপ্ত দুপুরে ঢাকা শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রিয়াজের মনে হচ্ছিল, জীবন যেন একটা শুকিয়ে যাওয়া গাছের মতো হয়ে গেছে। চারদিকে কেবল ব্যস্ততা, ক্লান্তি, হতাশা।

রিয়াজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। সদ্য বাবা মারা গেছেন, সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন তিনি। এখন মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে চলার দায় পড়েছে রিয়াজের কাঁধে। ক্লাস শেষ করে ছোট ছোট টিউশনি করে, আর নিজের পড়াশোনার চাপ— সব মিলিয়ে সে একা লড়ছে।

সেদিন দুপুরে ক্লাস শেষে হেঁটে টিউশনিতে যাচ্ছিল সে। মাথা ঘুরছিল, পকেটে মাত্র তিরিশ টাকা, কোনো রিকশায় ওঠার সাহস নেই। রাস্তায় একটা পুরনো দোতলা বিল্ডিংয়ের পাশে হঠাৎ সে দেখতে পেল— একটা কুকুর পড়ে আছে, জিহ্বা বের করে দম নিতে কষ্ট হচ্ছে, নিঃসন্দেহে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত।

মানুষজন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। কেউ একবার তাকিয়ে দেখছে না। কিন্তু রিয়াজ থেমে যায়।

সে বোতল থেকে সামান্য পানি বের করে হাতের তালুতে ঢেলে কুকুরটার সামনে ধরলো। প্রথমে একটু দ্বিধা, তারপর কুকুরটা সেই পানিটুকু চাটে, গিলে ফেলে।

রিয়াজ নিজের গায়ের রুমাল ভিজিয়ে কুকুরটার মাথা মুছে দিল। আশেপাশে কিছু লোক হাসছিল, কেউ কেউ বলছিল— “তুই কুকুর নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছিস কেন?”

রিয়াজ কিছু বলে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সেদিন সে টিউশনি করতে পারেনি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

রাতে, জ্বরের ঘোরে, সে একটা স্বপ্ন দেখে— এক বিশাল দরজা, সোনালী আলো ঝলমল করছে, ভিতরে এক শান্তির জগৎ। একজন বলছে—

— “তুমি জান্নাতের পথে আছো, কারণ তুমি এক পিপাসার্ত প্রাণীর প্রতি দয়া করেছিলে।”

ঘুম ভাঙার পর সে কোরআন খুলে বসে, হাদীস পড়ে। আর তখন সে হঠাৎ পড়ে হাদীসটি—

"একজন পতিতা একবার তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি খাওয়ায়, আর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন ও জান্নাতে প্রবেশ করান।"

রিয়াজের চোখে পানি চলে আসে।

সে ভাবে, “আমি তো কুকুরকে পানি দিলাম, কিন্তু আল্লাহ যদি আমার এই কাজটুকু কবুল করেন, তাহলেই আমার জীবন সার্থক।”

এরপর থেকে রিয়াজ বদলে যায়।

সে শুধু নিজের ক্লাস বা টিউশন নয়, সময় পেলেই যায় বৃদ্ধাশ্রমে, রাস্তায় অসহায় শিশুদের সঙ্গে সময় কাটায়, মাঝে মাঝে বস্তিতে গিয়ে খাবার বিতরণ করে— যদিও তার নিজের সংসারেও অভাব। কিন্তু সে বিশ্বাস করে—

"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই মানুষ, যে মানুষকে দয়া করে।”
(সহীহ বুখারী)

বছর কয়েক পর, রিয়াজ একটি এনজিও খুলে ফেলে, নাম রাখে— "এক ফোঁটা দয়া"। সেখানে সে গরীব শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, খাবার, আর শিক্ষার ব্যবস্থা করে।

একদিন তার ছোট ভাই রিফাত জিজ্ঞেস করলো—

— “ভাইয়া, এত কষ্ট করে তুই সব করিস কেন?”

রিয়াজ মুচকি হেসে বললো—

— “একদিন রাস্তায় একটা কুকুরকে পানি খাওয়াইছিলাম। সেদিন বুঝছিলাম, ছোট ছোট দয়ালু কাজও আল্লাহর কাছে কত বড়।”

রিফাত বললো—

— “তুই কি জান্নাতে যেতে চাস?”

রিয়াজ চোখ বন্ধ করে বললো—

— “আমি চাই, আল্লাহ একবার বলুন— ‘তুই চেষ্টা করেছিলি।’ তাহলেই যথেষ্ট।”
34 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: