সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরে আসতো আদিবা। ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আসতো পুরনো লাল ইটের বাড়িটায়, যেখানে তার ভাই আদনান প্রতিদিন অপেক্ষা করতো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। আদিবা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, আর আদনান সাত বছরের বড়, পেশায় স্কুল শিক্ষক।
তাদের বাবা-মা নেই, দশ বছর আগে একসাথে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেছে দুজনেই। তখন আদনান মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে, আর আদিবা তখন ছিল একটা সাত বছরের কচি মেয়ে, স্কুলের প্রথম ক্লাসে। পৃথিবী যেন একদিনেই তাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ছায়া।
কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া দিন থেকেই আদনান হয়ে ওঠে আদিবার বাবা-মা, বন্ধু, অভিভাবক, আশ্রয়— সবকিছু।
গল্পটা সেখান থেকেই শুরু।
আদনান চাকরি নিয়ে যখন গ্রামের স্কুলে চলে গেল, শহরের চাকরির অফার পেছনে ফেলে, তখন সবার চোখ কপালে উঠেছিল।
— “এত মেধাবী ছেলে শহরের স্কুল না পড়িয়ে এই গাঁয়ে কী করবি?”
— “আমার ছোট বোনকে বড় করতে হবে,” শুধু এটুকু বলেছিল সে।
তারপর সে গ্রামের একটা সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা নিতে শুরু করে। বেতন বেশি না, কিন্তু নিয়মিত। দিনে স্কুল, বিকেলে টিউশনি, রাতে আদিবার পড়া— এভাবেই কাটতে থাকলো তাদের জীবন।
আদিবা কখনো জানত না তার ভাই কতটা কষ্ট করে তাকে হাসিয়ে রাখে। তার পড়ার খরচ, জামাকাপড়, জন্মদিনে ছোট্ট একটা উপহার— সবই যেন ছিল ভাইয়ের হাসিমাখা ত্যাগের ছায়া।
একদিন, আদিবা ক্লাসে প্রথম হয়ে এলো, কলেজে একটা বড় স্কলারশিপ পেলো। সন্ধ্যায় সে দৌড়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো—
— “ভাইয়া! আমি পারলাম! আমি তোকে গর্বিত করলাম!”
আদনান কাঁপা গলায় বলেছিল—
— “তুই আমার গর্ব ছিলি, আছিস, থাকবি। আমি শুধু তোর পথটা একটু মসৃণ করে দিচ্ছি।”
সেই রাতে, প্রথমবারের মতো আদিবা জানালো—
— “ভাইয়া, আমি মেডিকেলে ভর্তি হতে চাই। ডাক্তার হতে চাই, যাতে তোর মতো কেউ কোনোদিন কষ্ট না পায়।”
আদনান হাসে, কিন্তু মনে মনে হিসাব কষে— কোচিং, বই, ভর্তি ফি— তার এই সামান্য আয়ে সম্ভব?
তবে অসম্ভব কিছুই নয়, যদি মন ঠিক থাকে।
পরের দিন থেকেই আদনান একবেলা খাওয়া বাদ দিলো। টিউশনির পর আরামদায়ক বিছানায় না শুয়ে রাত জেগে ঘরে খাতা-কলমে হিসাব মেলাতে লাগলো।
ছয় মাস পরে, সে নিজের মোটরবাইক বিক্রি করে দিল। তার প্রথম বাইক। বাবা বেঁচে থাকতে এনেছিল, সেই স্মৃতি মিশে থাকা বাহন। কিন্তু চোখে ছিল স্বপ্ন— বোনকে সাদা অ্যাপ্রোনে দেখার স্বপ্ন।
দিন যায়, রাত যায়।
আদিবা ভর্তি পরীক্ষায় টপ করলো। সরকারি মেডিকেলে চান্স পেলো।
যেদিন সে ভর্তি হতে ঢাকায় গেল, আদনান ট্রেনে বসে তার হাত ধরে বলেছিল—
— “আজ থেকে তুই নিজেকে হারালে চলবে না। তুই এখন আর শুধু আমার বোন না— তুই এই দেশের ভবিষ্যৎ। ডাক্তারদের কাছে সবাই আশা নিয়ে আসে। তুই যেন কাউকে নিরাশ করিস না।”
আদিবার চোখে জল, মুখে শুধু একটাই কথা—
— “তুই থাকলে আমি পথ হারাবো না ভাইয়া।”
ঢাকায় পড়াশোনা শুরু হলো। নতুন জগত, নতুন মানুষ। কিন্তু ভাই-বোনের সম্পর্কের মাঝে কোনো দূরত্ব আসে না। প্রতিদিন একটা মেসেজ, সপ্তাহে একবার ফোনকল, আর প্রতিমাসে একবার চিঠি— এখনো আদনান বোনকে হাতে লেখা চিঠি পাঠায়, কারণ সে বিশ্বাস করে, ভালোবাসা ছাপার কালি ছুঁয়ে গেলে চিরস্থায়ী হয়।
আদিবার রুমমেটরা প্রথমে হাসতো—
— “তোমার ভাই আজকালও চিঠি লেখে?”
সে গর্ব করে বলতো— “ওই চিঠিগুলোই আমার সাহস।”
সময় এগিয়ে চলে। পাঁচ বছর পর, আদিবা ডাক্তার হয়। ইন্টার্নশিপ শুরু করে, তারপর চাকরি পায় ঢাকার বড় একটি হাসপাতালে।
আর একদিন সন্ধ্যায়, হঠাৎ ফোন আসে— “ভাইয়া, আমি তোর জন্য একটা স্যুট কিনেছি! তুই শহরে আসিস, আমি তোকে নিজের উপার্জনের প্রথম টাকা দিয়ে ঈদের শপিং করাবো।”
সেই দিনটা ছিল আদনানের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন।
ঢাকায় এসে যখন আদিবা তাকে রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়, নতুন পাঞ্জাবি কিনিয়ে দেয়, তার হাত ধরে রাস্তা পার করায়— তখন আদনান প্রথমবার অনুভব করে, সে আর একা নয়। তার আদরের বোন বড় হয়েছে, তার ত্যাগ বৃথা যায়নি।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
একদিন হাসপাতাল থেকে ফোন আসে আদনানের কাছে।
— “স্যার, আমরা দুঃখিত, আপনার বোন ICU-তে ভর্তি।”
— “কী? কী হয়েছে ওর?”
— “ডেঙ্গুতে প্লেটলেট খুব কমে গেছে। খুব ক্রিটিক্যাল অবস্থা।”
আদনান দৌড়ে যায়। তিন দিনের লড়াই। অগণিত ওষুধ, রক্ত, ঘুমহীন রাত।
চতুর্থ দিনে ডাক্তারের মুখে হাসি—
— “উনি বাঁচবেন ইনশাআল্লাহ।”
সেই রাতে, চোখ খুলে আদিবা বলে—
— “ভাইয়া, তুই ছাড়া আমি কিছু না। আমি তোকে ভালোবাসি দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে বেশি।”
আদনান চোখ মুছে শুধু বলে—
— “আমি জানি, তুই আমার আদরের বোন। আল্লাহ তোর মতো বোন সব ভাইকে দিক।”
তারপর তাদের জীবন আবার স্বাভাবিক হয়। কিন্তু এখন আর ভাই একা কষ্ট করে না। আদিবা এখন সংসারে সমান সঙ্গী। তারা মিলে গ্রামে একটা ক্লিনিক খোলে— গরীব মানুষদের জন্য। নাম দেয়—
“আদরের আশ্রয়।”
এই ক্লিনিকে চিকিৎসা হয় ভালোবাসায়। কারণ এখানে একটা ভাই তার জীবন উৎসর্গ করেছে বোনের জন্য, আর একটা বোন বড় হয়ে সেই ভালোবাসার ঋণ শোধ করছে শত সহস্র মানুষকে সুস্থ করে তুলে।
আদরের বোন
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
31
Views
3
Likes
0
Comments
0.0
Rating