পাহাড়ে জন্মেছিল সে, মেঘ আর পাখিদের সঙ্গে। নাম—লুসাই চাকমা। মা রেখেছিলেন নামটা, লুসাই পর্বতমালার নাম অনুসারে। বলতেন, "তুইও একদিন পাহাড়ের মতো শক্ত আর নিরীহ হবি, মা।"
রাঙামাটির গভীর এক গ্রামে বড় হয়েছে লুসাই। বাঁশের ঘর, জুমচাষের পেছনে মায়ের কষ্ট, আর নৌকার শব্দে ভরা দুপুর—এসবই ছিল তার জগৎ। একা মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা এই মেয়েটি কখনো স্কুলে যায়নি নিয়মিতভাবে, কিন্তু পড়তে-লিখতে শিখে গিয়েছিল নিজের চেষ্টাতেই। তার প্রিয় বই ছিল—সংবিধান। সে বুঝতে চেয়েছিল, কেন তাদের মতো পাহাড়ি মানুষদের জন্য সব সময় একরাশ অবহেলা থাকে।
"আমরা কি বাংলাদেশি না?" —এই প্রশ্নটা লুসাই প্রথম করেছিল ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়, যখন এক পর্যটক তার নাম শুনে হেসে বলেছিল, “তোমরা তো ভুটান-থুটান কোথাও থেকে আসছো, তাই না?”
লুসাই বুঝে গিয়েছিল, তার পরিচয় কেউ চিনতে চায় না, জানতে চায় না। শহরের মানুষ পাহাড়কে দেখে 'বিউটি স্পট' হিসেবে, কিন্তু এই পাহাড়ের মানুষগুলোর প্রাণ, কষ্ট, কান্না—তাদের কেউ দেখে না।
---
১৮ বছর বয়সে লুসাই শহরে আসে, পড়তে—রাঙামাটি গভর্নমেন্ট কলেজে। ওখানেই তার জীবন বদলে যায়। প্রথমবার সে দেখে কেমন করে "মাইনোরিটি" শব্দটা তার পরিচয়কে খোঁচা মারে প্রতিনিয়ত। নাম বললেই শিক্ষকের কপাল কুঁচকে যায়, হোস্টেলের ফর্মে ‘Ethnicity’ জিজ্ঞাসা করা হয় যেন সে ভিন্ন গ্রহের মেয়ে।
তবুও, লুসাই হার মানে না। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পড়তে সে জেনে যায় ‘সিস্টেম’ নামক এক অদৃশ্য দানব কীভাবে সব ‘অন্যরকম’ মানুষদের তলিয়ে রাখে। তার কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর আসে—নরম, কিন্তু ধারালো।
একদিন ক্যাম্পাসে এক বিতর্কে সে বলে ফেলে—
“বাংলাদেশ শুধু সমতলের নয়, পাহাড়েরও। ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয়—এসব মুছে দিলে শুধু পতাকা হাতে থাকলেই দেশপ্রেম হয় না।”
সেই বক্তব্য ভাইরাল হয়ে যায়। কেউ বলে, “সে রাষ্ট্রদ্রোহিতা করেছে।” কেউ বলে, “পাহাড়িরা সব খারাপ না, কিন্তু...”
তবে কেউ লুসাইকে বোঝে না যে, সে শুধু বলেছিল—“আমিও মানুষ। আমিও এই মাটির সন্তান।”
---
কয়েক মাস পর লুসাইকে দেখা যায় রাঙামাটির রাস্তায়, ছেলেমেয়েদের নিয়ে পথশিক্ষা দিচ্ছে। পেট ভরাতে না পারলেও সে তাদের শেখাচ্ছে, “তোমাদের কণ্ঠ কেউ বন্ধ করতে পারবে না, যদি তোমরা জানতে শেখো।”
হঠাৎ একদিন রাতে সেনা ক্যাম্পের এক গাড়ি এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। অভিযোগ—"বিদ্রোহে প্ররোচনা"। স্থানীয় পত্রিকায় আসে একটা ছোট্ট খবর—
“এক পাহাড়ি তরুণী রাষ্ট্রবিরোধী কথাবার্তার জন্য আটক।”
শহর নীরব থাকে। কোনো মানবাধিকার কর্মী তাকে নিয়ে কথা বলে না।
তবে পাহাড় বোঝে। রাতের বৃষ্টির শব্দে যেন জুমচাষী মায়েরা কাঁদে।
কয়েকদিন পর ছাড়া পায় লুসাই, চুপচাপ, আহত অবস্থায়। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করে না, “তোমাকে মারল?”
সে শুধু হাসে, বলে,
“এই দেশটা এখনো আমাদের না। তবু আমরাও এই দেশেরই কেউ। আমি পাহাড় ছাড়ব না। যতবার থামাবে, ততবার বলব—আমি আছি।”
---
আজ ৫ বছর পর, লুসাই চাকমা রাঙামাটির এক ছোট্ট পাহাড়ি স্কুলের শিক্ষক। ওর লেখা কবিতা আজও ছাপা হয় না কোনো নামকরা ম্যাগাজিনে। কিন্তু প্রতি শনিবার সে বাঁশের চাটাইতে বসে পাহাড়ি শিশুদের শেখায়—সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ।
“সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার রাখে।”
ওরা বুঝে না পুরোটা, তবে মুখস্থ বলে যায়। কারণ ওরা জানে, লুসাই আপা যখন বলেন—“তোমরা কারো চেয়ে কম নও”—ওটা শুধু একটা লাইন না, ওটা একটা জীবন।
---
গল্পের শেষে কেবল একটা বাক্য লেখা থাকে:
"লুসাই চাকমা আজও পাহাড়েই আছে—চুপচাপ, কিন্তু বদলের গল্প হয়ে।”
লুসাই চাকমা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
73
Views
7
Likes
1
Comments
0.0
Rating