এক ডিভোর্সী নারীর গল্প

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
চট্টগ্রামের একটি ছিমছাম পাড়ায় ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকেন তনু রওশন। বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে কিছুদিন হলো। চুলে এখনো চকচকে কালো ছোঁয়া, মুখে একধরনের স্থির দৃঢ়তা, আর চোখে কেমন এক অপার শূন্যতা।

তিন বছর আগে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। সবার মতো তিনিও ভেবেছিলেন, বিয়ে মানেই নিরাপত্তা, সঙ্গ, ভালোবাসা। কিন্তু কামরুল নামের লোকটি তাঁর জীবনে ভালোবাসার বদলে এনেছিল দোষারোপ, অবহেলা আর চিরস্থায়ী কষ্ট।

তাদের একটি সন্তান আছে—ছোট্ট মেয়ে, নাম লিজা। এখন ক্লাস টু-তে পড়ে। সারাদিন সে তনুর চারপাশে ঘুরঘুর করে, অনেকটা যেন বেঁচে থাকার কারণ।

তনু আগে কলেজে ইংরেজির লেকচারার ছিলেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হন—পরিবার, সমাজের চাপ, মেয়ের দেখভাল সব মিলিয়ে স্থির একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এখন তিনি বাসায় বসেই টিউশন করান। অনলাইনে ফ্রিল্যান্স অনুবাদ কাজও করেন। খুব বেশী আয় হয় না, তবে মেয়েকে স্কুলে পড়াতে, নিজেদের খরচ চালাতে পেরে যান কোনোমতে।

প্রতিদিন সকালে তনু লিজাকে স্কুলে দিয়ে এসে বারান্দায় বসেন এক কাপ চা নিয়ে। সেই চায়ে অতীতের বিষাদ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর বর্তমানের নিরালম্ব একাকীত্ব—সবকিছু মিশে থাকে।

একদিন হঠাৎ ফ্ল্যাটের উল্টোপাশে এক নতুন ভাড়াটিয়া আসে—নাম আরিফ রেজা। একজন সাংবাদিক, ঢাকায় ছিল, এখন চট্টগ্রামে বদলি হয়েছে। চশমা পরা, অল্পবিস্তর দাড়ি, সংযত স্বভাবের মানুষ। প্রথম কয়েকদিন শুধু সিড়িতে দেখা হতো, হালকা হাসিমুখে “আসসালামু আলাইকুম” বা “সুপ্রভাত” বলেই চলে যেত।

তারপর একদিন, সন্ধ্যায় লিজা হঠাৎ পড়ে যায় সিঁড়িতে। তনু তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসে দেখেন আরিফ লিজাকে কোলে করে ধরে রেখেছেন। খুব সাধারণ এক ঘটনা, কিন্তু তনুর ভেতর হঠাৎ একটা অচেনা কৃতজ্ঞতা ও সংকোচ জেগে ওঠে।

সেদিনের পর, তাঁদের মাঝে আলাপ হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বোঝা যায়, আরিফও একা। বিয়ে করেনি কখনো, কাজ আর লেখালেখিতেই ডুবে থাকতেন। পরিবার ঢাকায়।

তনু নিজের সম্পর্কে কিছুই বলেন না—আরিফও জিজ্ঞাসা করে না। শুধু একদিন সে বলে,
“আপনি একা মানুষ, মেয়েকে এত ভালোভাবে বড় করছেন… দেখলেই শ্রদ্ধা হয়।”
তনু একটু হেসে বলে, “শ্রদ্ধার চেয়ে সহানুভূতিই বেশি পাই আমি। সবাই ভাবে, ডিভোর্সী মানেই বোধহয় ব্যর্থ মানুষ।”
আরিফ মাথা নেড়ে চুপ করে যায়। কিন্তু সেই চুপ করায় কোনো অপমান নেই, ছিলো বোঝাপড়ার নীরবতা।

বছর খানেক পেরিয়ে যায়। আরিফ এখন মাঝে মাঝে মেয়েটার জন্য চকোলেট আনে, স্কুলের প্রজেক্টে সাহায্য করে, কিন্তু এক চুলও সীমা লঙ্ঘন করে না।

তনু বুঝে, এই শহরে তার জন্য কেউ দাঁড়ায়নি কোনোদিন—কিন্তু এই মানুষটা পাশে থেকেও কোনো দাবি রাখেনি। সে চায় না নতুন করে বেঁধে পড়তে, আবারও কোনো সম্পর্কে আটকে যেতে। কিন্তু সে এটাও জানে—সব পুরুষ কামরুল নয়।

এক রাতে, চুপচাপ বারান্দায় বসে তারা দুজন চা খাচ্ছিল। নিচে বৃষ্টি পড়ছিল ঝিরঝির করে। আরিফ বললো,
“আপনি চাইলে, আমরা একসাথে এক কাপ চা খেতে পারি মাঝে মাঝে। সম্পর্ক না হয় ‘বন্ধুত্বের’ নামে থাকুক। কেউ কারো অধিকার না দাবি করুক… শুধু সাহচর্য থাকুক।”

তনু কিছু বলে না। শুধু সামান্য মাথা নাড়ে। সেই হালকা সম্মতির ভেতর ছিলো হাজারো না বলা কথা, শত বছরের ক্লান্তি আর এক নতুন আশার দোলা।


---

শেষ নয়, এ এক শুরু...
কারণ ডিভোর্সী মা মানে ব্যর্থ নারী নয়। তিনি একা নন, তিনি সংগ্রামী। তনু রওশন শুধু একজন চরিত্র নয়, অনেক নারীর প্রতিচ্ছবি—যাঁরা চুপচাপ ভালোবাসেন, সংগ্রাম করেন, আবার নতুন করে জীবন গড়েন।
68 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: