সকাল সাতটা। ঢাকা শহরের চেনা কোলাহল আর ব্যস্ততা সারা গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তায় যানজট, হাঁটতে হাঁটতে মানুষজন তাদের নিজের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে কাজে ব্যস্ত। এই শহরে হাজারো মানুষের জীবনের মিলন, বিভাজন আর স্বপ্নের গল্প লুকিয়ে আছে। তাদের মাঝেই ছিল তানভীর।
তানভীর — ত্রিশোর্ধ্ব, লম্বা চেহারা, পরিপাটি কাপড়-পরিচ্ছদ আর শান্ত স্বভাবের মানুষ। সে একটি বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং ম্যানেজার। পেশাগত জীবনে সাফল্যের সাথে এগিয়ে চলা তানভীর নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বরং সংযত ছিল। তার ছোট একটা ফ্ল্যাট শহরের পশ্চিম সাইডে, যেখানে সে একাই থাকত। শহরের ভিড়ে একাকীত্ব তার সঙ্গী।
সেদিন সকালে অফিস যাওয়ার জন্য তানভীর বেল্কোনিতে দাঁড়িয়ে চা নিয়ে নিজের আজব ভাবনায় ডুবে ছিল। দূরে রাস্তার কোলাহল আর অফিসগামী মানুষের মিছিল দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল — কতগুলো মানুষের জীবনে কী না লুকিয়ে থাকে, কারো প্রেমের গল্প, কারো একাকীত্ব। এই ভিড়ে সে নিজের একাকীত্ব বেশ গাঢ় বোধ করছিল।
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে নাম দেখা গেল—‘মম’। মায়ের কণ্ঠস্বর শুনেই তার মুখে অজানা এক উষ্ণতা ফুটে উঠল। মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে তার দিনটা একটু আলাদা হল।
“তুমি কেমন আছো, তানভীর? তোমার কাজ কেমন চলছে?” মায়ের কণ্ঠে ছিল যত্ন আর ভালোবাসা।
“ভালোই আছি মা, আজকের মিটিংগুলো একটু কঠিন হতে পারে, তবে চেষ্টা করব,” তানভীর বলল।
মায়ের কথায় তার মনে আসলো, তার জীবনে এখন পর্যন্ত প্রেমের গল্পের অভাব। কলেজ জীবনে একটা সম্পর্ক হয়েছিল, কিন্তু সেই গল্প শেষ হয় কষ্টকরভাবে। তারপর থেকে তানভীর নিজের মনকে ব্যস্ত রেখে প্রেম থেকে দূরে থাকল।
---
অফিসে পা রাখতেই তার নজর পড়ল নতুন এক সহকর্মীর দিকে। সাদাবাহারি শাড়ি, চোখে চশমা, আর চুল বাঁধা, নাম তার মিথিলা। সে ছিল কোম্পানির মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে নতুন যোগদান করা জুনিয়র এক্সিকিউটিভ। তার চোখে একটা ঝিলমিল ছিল, আর কথা বলার ভঙ্গিতে ছিল বিনয় ও আত্মবিশ্বাসের মিশেল।
“তুমি কি এই প্রজেক্টের লিড নেবে?” মিথিলা সরাসরি প্রশ্ন করল তানভীরকে।
“হ্যাঁ, আশা করি আমরা ভালো কিছু করতে পারব,” তানভীর বলল, এবং তার ভেতরে অজানা এক রোমাঞ্চ কাজ করতে লাগল।
দিন যায়, কাজের মাঝে মাঝে তারা একে অপরের সাথে একটু বেশি আলাপ শুরু করল। অফিসের চা বিরতিতে গল্প হতে লাগল, শখের কথা, বইয়ের কথা, শহরের জীবন আর ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে।
একদিন অফিসের বাইরে একসাথে কফি খেতে গিয়ে মিথিলা বলল, “তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়, যেন এই বিশাল শহরটা একটু ছোট হয়ে গেছে।”
তানভীরও একটু হাসি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এই শহরের ব্যস্ততার মাঝে আমরা যদি নিজেদের মতো করে কারো সঙ্গ পাই, তাহলে জীবন একটু সহজ হয়।”
তাদের আলাপ গভীর হতে লাগল। মিথিলার সরলতা আর তানভীরের শান্ত মেজাজে ধীরে ধীরে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল, যার মাঝেই লুকিয়ে ছিল স্পন্দন।
---
কিছুদিন পর, এক অফিসের পার্টিতে তাদের মধ্যে একটা মুহূর্ত এলো, যখন তারা দুজনে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গীত বাজছিল, আলো মৃদু, আর চারপাশে হাসি আর আড্ডার রং।
তানভীর হঠাৎ মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি জানো, শহরের এই জায়গাগুলোতে কখনো কখনো একাকীত্ব কেমন গাঢ় হয়?”
মিথিলা একটু নরম কণ্ঠে বলল, “আমিও তা বুঝি। কিন্তু এই জগতে কারো পাশে থাকা খুব জরুরি।”
তানভীর একটু কাছে এসে বলল, “তুমি আমার পাশে থেকো।”
মিথিলার চোখে তখন এক অদ্ভুত ঝলক, আর সে সায় দিল।
---
এরপর থেকেই তাদের সম্পর্ক একটু বেশি ঘনিষ্ঠ হতে লাগল। তারা শহরের ছোট ছোট জায়গায় একসাথে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল—লেকসাইড পার্ক, বইয়ের দোকান, পুরোনো ক্যাফে। একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলোতে ছিল মিষ্টি সপন আর একরকম অদৃশ্য বন্ধন।
কিন্তু জীবন যেমন সব সময় মসৃণ হয় না, তানভীরের জীবনে আসলো কিছু কঠিন মুহূর্ত। অফিসে একটি বড় প্রজেক্টে সমস্যা হল। প্রজেক্টের দায়িত্ব ও চাপ তাকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল। মিথিলা চাইলেও তাকে সাহায্য করতে পারছিল না পুরোপুরি, কারণ তার নিজস্ব বাধাও ছিল।
এদিকে, তানভীরের অতীত থেকেও একজন প্রবেশ করল তার জীবনে—সাবেক প্রেমিকা, লায়লা। হঠাৎ করে লায়লা অফিসের ক্লায়েন্ট হয়ে আসলো। তার উপস্থিতি তানভীরের মনে পুরনো স্মৃতির ঢেউ তুললো, যা সে বুঝতে পারছিল না কীভাবে মোকাবিলা করবে।
তানভীর বুঝতে পারল, শহরের এই ব্যস্ত জীবনে প্রেম আর সম্পর্ক একসাথে থাকার জন্য কতটা কঠিন। কিন্তু মিথিলা ও তার বন্ধুত্বের মাঝেই সে খুঁজছিল তার হারানো শান্তি।
চলবে...........................
দ্বিতীয় বসন্ত (১)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
52
Views
8
Likes
0
Comments
0.0
Rating