মাথায় লম্বা একটা ঘোমটা দিয়ে বাসর ঘরে বসে আছে ইরা। চোখে তার টিপটিপ করছে নোনা জল। কিছুতেই কান্না থামিয়ে রাখতে পারছে না সে।
কি থেকে কি হয়ে গেল মেয়েটির জীবনে। কত স্বপ্ন ছিল তার এই বাসর রাতকে ঘিরে, তার ফিউচার হাজব্যান্ডকে নিয়ে... কিন্তু সব স্বপ্ন আজ যেন এক মুহূর্তে বালিঘরের মতো দুমরে মুচড়ে ভেঙে গেল। সাথে ধ্বংস হয়ে গেল তার ফুলের মতো সুন্দর জীবন টা।
আজ তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল খন্দকার বাড়ির বড় ছেলে রেহান খন্দকারের সাথে... কিন্তু সে নাকি অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে বলে আজ ভোরবেলা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। তাই রেহান খন্দকারের মা রুমি খন্দকার তাঁর ছোট ছেলে রাহাত খন্দকারের সাথে তার বিয়ে দিয়েছেন।
আর সেটা কিছুতেই মেনে নিতে প্রথমে না ইরা।
আচ্ছা সে কি কোনো কাঠের পুতুল, যে তাকে দিয়ে সবাই যা করবে তাকে সেটাই মাথা পেতে মেনে নিতে হবে! তার ইচ্ছের কি কোনো মূল্য নেই কারো কাছে? এতটাই অবহেলিত এবং বোঝা সে সবার কাছে? তাহলে কি সত্যিই মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই পাপ! সে মেয়ে হয়েছে জন্মেছে বলে তার কোনো মতামত না নিয়েই তার পরিবার যে আজ তার দেবর হওয়ার কথা ছিল তার সাথে বিয়ে দিয়েছে!
হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ। বোধহয় কেউ এসেছে! কে হতে পারে? রাহাত... হ্যাঁ, রাহাতই হবে হয়তো... সে ছাড়া আর কে আসবে এখন?
রাহাতের উপস্থিতি টের পেয়ে ইরার কেন জানি বুকটা ধুকপুক করতে লাগলো। শরীরটাও কেন যেন কাঁপতে শুরু করেছে!
আগন্তুক আস্তে আস্তে বিছানার কাছে এসে ইরার পাশে বসে পড়লো। এতে ইরার হার্ট আরো দ্রুত গতিতে ছুটতে লাগলো। রাগের তুলনায় তার এখন কেন যেন ভয়টাই বেশি হচ্ছে।
আগন্তুক এবার কথা বলতে আরম্ভ করলো। তার গলায় শোনা গেল এক রাশ হতাশা। তবে গলা টা রাহাতের নয়! ইরার বুঝতে অসুবিধা রইলো না এটা রাহাতের মা রুমি খন্দকারের গলা। তিনি গম্ভীর গলায় ইরাকে বলতে লাগলেন... " মা ইরা, আমি জানি আজ তোমার সাথে যেটা হয়েছে তুমি একদম তার জন্য প্রস্তুত ছিলে না! আমরাও ছিলাম না। যেন অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে গেল সব কিছু। বিশ্বাস করো, তোমাকে ঠকানো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, তোমার আর রেহানের বিয়ে টা যদি একবার হয়ে যায় তাহলে রেহান ওই মিতুকে ভুলে যাবে! কিন্তু ও ভোরবেলা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে শুধুমাত্র মিতুর জন্য।
ইরা, আজ যে আমার ছেলে রেহান খন্দকারের বিয়ে, কাল তোমার আর রেহানের জন্য করা বৌভাতে আমি ইনভাইট করেছিলাম বাংলাদেশের টপ বিজনেসম্যানদের। কিন্তু তারা যখন শুনবে আমার বড় ছেলে অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, তখন আমার এত বছরের সঞ্চিত মান-সম্মান এক ধাক্কায় শেষ হয়ে যাবে। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যাবে এই নিউজ টা। তখন আমি সবাইকে মুখ দেখাবো কি করে?
আই এম ভেরি সরি মা, শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ রক্ষায় আমি আমার ছোট ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছি। তুমি এর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও। হ্যাঁ তবে আরেকটা কথা, আমি কিন্তু তোমাকে উপযুক্ত বৌমা মনে করেই আমার ছেলের বউ করে নিয়ে এসেছি। আজ থেকে তুমি এই খন্দকার বাড়ির ছোট বউ।" এই বলে থেমে গেলেন রুমি খন্দকার।
ইরা ওনার কথাগুলো শুনে কেন জানি কোনোরকম রিয়েকশন দেখাল না। কিছু বললোও না, শুধু চুপচাপ ঘোমটার আড়ালে মাথা নিচু করে বসে রইলো সে। রুমি খন্দকার খানিকক্ষণ সময় চুপ করে থেকে আবার বলতে লাগলেন... " ইরা, আমি জানি মা.. তোমার রাহাতকে এত সহজে মেনে নেওয়া খুব কষ্টকর হবে। কিন্তু আমি মনে করি, ওকে মেনে নেওয়াটাই তোমার জন্য একদম বেটার হবে। কারণ, ও তোমাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে। তাকে যখন আমি আজ সকালে বলেছিলাম, রাহাত তুই কি ইরাকে বিয়ে করতে পারবি? সে আমার এককথায় রাজি হয়ে যায়!
ইরা মা.. প্লিজ, তুমি ওর সাথে আজ কোনোরকম ঝামেলা কোরো না। ওকে তুমি বুঝতে দিও না, তোমাকে এই বিয়ে টা করতে বাধ্য করা হয়েছে! প্লিজ মা.. আমার কথাগুলো তুমি রেখো! প্লিজ..." কথাগুলো বলে রুমি খন্দকার ইরার বা হাত টা নিজের দু'হাতের মাঝে নিয়ে কান্না মিশ্রিত স্বরে বলতে লাগলেন... " বলো ইরা, তুমি আমার কথা রাখবে। তুমি আমার রাহাতের সাথে কোনোরকম অপ্রিতিকর বিহেভিয়ার করবে না! বলো মা, চুপ করে থেকো না বলো!"
রুমি খন্দকারের এমন কথাগুলো শুনে ইরা কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না! বুঝতে পারছে না হ্যাঁ বলা টা বেটার হবে, নাকি না বলা টা? কিন্তু রুমি খন্দকারের এমন জোরাজুরিতে বেশ বাধ্য হয়েই ইরা নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ইতস্তত গলায় বলল... " আ.. আ.. আচ্ছা.. ঠিক.. ঠিক আছে।"
ইরার কথা শুনে রুমি খন্দকার একগাল হেসে আবার বলতে লাগলেন... " থ্যাংক ইউ ইরা, তোমাকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি জানতাম তুমি আমার কথা রাখবে! তাহলে আমি রাহাতকে পাঠাচ্ছি। তুমি থাকো।" কথাগুলো বলে রুমি খন্দকার বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
______________________________
" মা তুমি সত্যি বলছো.. ওই ইরা আজ আমার সাথে কোনোরকম ঝামেলা করবে না! উফ্ মা, আমি যে আজ কত খুশি, সত্যি তোমাকে আমি বলে বোঝাতে পারবো না। শেষ পর্যন্ত আমার এতদিনের বাসনা পূরণ হতে চলেছে। ইরা আহমেদ, তুমি সেদিন ভার্সিটিতে সক্কলের সামনে থাপ্পর মেরেছিলে তাই না, এবার দেখো আমি তোমার কি হাল করি।" এই বলে অট্টহাসিতে মেতে পড়লো রাহাত খন্দকার। সাথে তার মা রুমি খন্দকারও।
এভাবে খানিকক্ষণ চলার পর রুমি খন্দকার রাহাতকে বলতে লাগলেন... " রাহাত, যা এবার তুই তোর বাসর ঘরে যা! তোর এতদিনের বাসনা আজ পূরণ হবে, গিয়ে সেলিব্রেট কর।"
" ওকে মা, তুমিও গিয়ে শুয়ে পড়ো। গুড নাইট।"
" হুম.. গুড নাইট।"
একগাল হেসে মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো রাহাত। রুমের সামনে পৌঁছে এক টা ডেভিল হাসি দিয়ে ভেতরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো সে।
রাহাতের উপস্থিতি টের পেয়ে ইরা হয়তো রাগে ফুঁসতে লাগলো। কিন্তু কেন জানি সেটা প্রকাশ করলো না।
রাহাত দরজা টা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো বিছানার দিকে। তার মুখে এখন বিদ্যমান এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি। যার অর্থ, বহু দিনের একটি বাসনা এবং লালসা। যা আজ সময় এসেছে পূরণ করার।
To Be Continued......................
অগ্নি কন্যা (১)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
41
Views
3
Likes
0
Comments
0.0
Rating