অভিশপ্ত আয়না

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গ্রামের প্রান্তে, এক নির্জন বটগাছের তলায় ছয় ফুট উঁচু একটা পুরনো বাড়ি। বাড়িটির মুখোমুখি ছিল একটি আয়না, যা দেখতে অনেকটা বড় আর চমকপ্রদ। সবাই বলত, ঐ আয়নাটার কোনো বিশেষ গুণ আছে, কিন্তু সেই গুণ নিয়ে ঘুম ভেঙেছে অনেকের।

কিন্তু কেউ জানতো না, এই আয়নাটা শুধু দেখায় না—সে খুঁজে বের করে মানুষের অন্তরের সব গোপন সত্য। আর এই সত্য কখনোই সুখের নয়, বরং শোক, দুঃখ আর অভিশাপের।


---

রূপক নামে একজন শহর থেকে গ্রামে এসে সেই বাড়িটাতে উঠল। সে ছিলেন তরুণ লেখক, যাকে নতুন গল্পের অনুপ্রেরণা খুঁজতে বলা হয়েছিল। বাড়ির প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে সে প্রথম নজর দিল ঐ আয়নার দিকে। আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নিজের মুখ দেখল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই মুখ তার চোখের সামনে বদলে যেতে লাগল—এক অজানা ভয়ের ছবি, আরেক অচেনা রূপ।

রূপকের মনে হল, আয়নাটা যেন তার সবচেয়ে গোপন অনুভূতিকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। একটু আগলে রেখে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।


---

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রূপকের জীবনে নানা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। রাতে ঘুম ভেঙে যেত যেন আয়নার মুখ তার স্বপ্নে ভেসে উঠছে। প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার মুখ পরিবর্তন হতো—মনে হতো তার হারানো কোনো সুখ, কোনো পেন্ডিং দুঃখ, কোনো অপরাধের আভাস।

একদিন রাতে, সে ঠিক করল, এই আয়নার রহস্য উদঘাটন করবে। বাড়ির বয়স্ক মালিকের কাছে গিয়ে রূপক জানতে চাইল, “এই আয়নাটা কেন এত রহস্যময়?”

বৃদ্ধ লোক বলল, “এই আয়নাটা একবারে শত শত বছর আগে তৈরি হয়েছিল এক জাদুকরী দ্বারা। সেই আয়না যা দেখায়, তা হতেই হবে সত্য, কিন্তু সত্যের সাথে থাকে অভিশাপ।”


---

রূপক ভেবে পেল, এই আয়না তার অন্তরের ভয়, দুঃখ আর অপরাধের মুখ দেখায়। সে নিজেকে জানার চেষ্টা করল, কিন্তু সে যা দেখল, তা তাকে আরও বিষণ্ণ করল।

একদিন, রূপক নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বুঝল, তার জীবনটা এক বিরাট মিথ্যার খেলা। সে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে, নিজের অজান্তে অনেক মানুষের বেদনা বাড়িয়েছে। এই উপলব্ধি তাকে সেদিন রাতেই গায়ে শিউরে উঠায়।


---

তারপর রূপক সিদ্ধান্ত নিল, এই অভিশপ্ত আয়নাকে ভেঙে ফেলবে। কারণ সত্যের বেদনা সহ্য করা কঠিন, কিন্তু মিথ্যার লাঞ্ছনা আরও খারাপ।

পরদিন সকালে, রূপক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “তোমার অভিশাপ থেকে আমি মুক্তি চাই!”

সে আয়নাকে ভাঙার চেষ্টা করল, কিন্তু আয়না অটল ছিল, যেন সে মানুষের অন্তর থেকে বাঁধা হয়েছে।


---

রূপকের শেষবারের মতো একটি সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সে তার জীবনের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াল, সেই সব ভুল স্বীকার করল, ভুল শুধরাল, ক্ষমা চাইল।

ধীরে ধীরে আয়নার আভাস বদলাতে লাগল। আরেক দিন সকালে যখন রূপক আয়নার সামনে দাঁড়ালো, সে দেখল আয়নাটা এখন আর অভিশপ্ত নয়, বরং নতুন এক আশার প্রতীক।


---

রূপক বুঝল, সত্য স্বীকার করলে অভিশাপ রূপ নেয় না, সে রূপ নেয় মুক্তির।
39 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: