জোৎস্নার নিচে বোধিবৃক্ষ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাঙামাটির পাহাড়ি গ্রামে ছোট একটি বসতি—নাম তার রাঙাচুড়ি। জনসংখ্যা কম, বেশিরভাগই চাকমা, মারমা আর তঞ্চঙ্গ্যাদের মিশ্র বসবাস। গ্রামের মাঝখানে একটা পুকুর, আর পুকুরের পাশে বহু পুরোনো একটি বোধিবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে—অনন্ত শান্তির ছায়া নিয়ে।

এই গাছের নিচে প্রতি পূর্ণিমায় বসে প্রার্থনা করে গ্রামের লোকজন। তারা বলে, এখানে ভগবান বুদ্ধের করুণা ছায়া ফেলে রাখে রাতের জ্যোৎস্নায়।

এই গল্প সেই গাছকে কেন্দ্র করে এক তরুণী—আরন্যা—এবং তার হারানো পথের গল্প।

আরন্যার বয়স মাত্র কুড়ি। ছোটবেলায় সে ছিল মন্দিরপাগল—মাকে অনুসরণ করে পূর্ণিমার রাতে লন্ঠন হাতে ছুটে যেত বোধিবৃক্ষের নিচে, প্রার্থনা করত,
“ভগবান বুদ্ধ, তুমি যেন আমার মাকে ভালো রাখো।”

তার বাবা ছিলেন এক কাঠুরে, প্রতিদিন পাহাড়ে কাঠ কাটতে যেতেন, আর মা ছিলেন গৃহিণী, যিনি মাঝে মাঝে পুঞ্জিতে ধর্মচর্চা করাতেন। কিন্তু জীবনের শান্ত ঝরনায় হঠাৎ বজ্রপাত হয়।

একদিন হঠাৎ বাবা ফেরেননি। পাহাড় ধসে চাপা পড়ে মারা যান। সেই শোক এতটাই ভারি হয়ে পড়ে যে, মা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
তখন আরন্যা ছিল ক্লাস নাইনে। ধীরে ধীরে সে স্কুল বাদ দেয়, মায়ের সেবাতেই জীবন জড়িয়ে নেয়।

কিন্তু সময় যত গড়ায়, আরন্যার ভিতরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি জমা হতে থাকে। একরাশ প্রশ্ন, একরাশ হতাশা।

"ভগবান বুদ্ধ তো বলেন, জীবন দুঃখময়—কিন্তু এ দুঃখ থেকে মুক্তি কোথায়?"

এক রাতে, পূর্ণিমার আলোয় সে একা গিয়ে দাঁড়ায় বোধিবৃক্ষের নিচে। চারপাশ নিঃশব্দ, শুধু গাছের পাতাগুলো হাওয়ায় নড়ে ওঠে, যেন এক গভীর নিঃশ্বাস।

আরন্যা চোখ বন্ধ করে বলে,
“ভগবান, যদি তুমি সত্যিই করুণাময় হও, তবে আমাকে কিছু দেখাও—একটা দিশা দাও।”

কিন্তু উত্তর আসে না।

এদিকে গ্রামের একদল তরুণ শুরু করে এক নব্য বৌদ্ধিক আন্দোলন—তারা চায়, পাহাড়ে শিক্ষা ও ধর্মচর্চার মেলবন্ধন হোক। সেই দলে একজন যুবক ছিল—সুবোধ। শান্ত, গভীরচিন্তক, আর তার চোখে ছিল এক অনন্য আলো।

সুবোধ একদিন আরন্যার বাড়িতে আসে।
বলল,
“তোমাকে পুঞ্জিতে দেখা যায় না অনেকদিন। তুমি কি আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে না? আমাদের একাডেমিতে শিক্ষক দরকার। তুমি তো ক্লাস টেনে খুব ভালো করেছিলে।”

আরন্যা একটু হাসে, তবু তাতে ক্লান্তির ছাপ।
“আমি ভীষণ ক্লান্ত সুবোধ। মায়ের দায়িত্ব, নিজের হারিয়ে যাওয়া পথ—সব কিছু একসাথে।”

সুবোধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ভগবান বুদ্ধ বলেন—‘অত্তা হি অত্তানো নাথো’, নিজের পরিত্রাণ নিজেকেই করতে হয়। তুমি চাইলে আমরা পাশে আছি।”

কথাগুলো আরন্যার মনে গেঁথে যায়। পরদিন সকালে সে প্রথমবারের মতো অনেকদিন পর পুঞ্জিতে যায়।

সেখানে গুম্ফার ভিতর এক প্রবীণ ভিক্ষু, ভন্তে আনন্দসেন, বসে ধ্যান করছিলেন।
আরন্যা তাকে নমস্কার জানিয়ে বলল,
“ভন্তে, আমি দিশাহীন। কী করব বুঝি না।”

ভিক্ষু চোখ খুলে তাকিয়ে বললেন,
“জীবনে দুঃখ আসবেই কন্যা। কিন্তু বুদ্ধ বলেছেন, দুঃখের কারণ অনাসক্তি নয়, আসক্তি। তুমি তোমার দুঃখকে আঁকড়ে রেখেছো। ওটা ছাড়তে শেখো। ভালোবাসার মধ্যেও শান্তি থাকে, যদি সেটি নির্ভরশীল না হয়।”

এই কথাগুলো যেন আরন্যার হৃদয়ে নতুন জানালার মতো খুলে যায়।
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নেয়—সে মায়ের যত্নও নেবে, আবার ধীরে ধীরে নিজেকে ফিরে পাবে।

দিন পেরোয়।
আরন্যা একাডেমিতে যোগ দেয়—শিশুদের পড়ানো শুরু করে। সন্ধ্যাবেলা মায়ের ওষুধ আর সেবা, আর রাতে নিজের পড়াশোনা। ধীরে ধীরে সে প্রাণ ফিরে পায়।

একদিন সুবোধ তাকে বলল,
“তুমি জানো, আমি বরাবর তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু তোমার সম্মতি ছাড়া একপা এগোব না।”

আরন্যা তার দিকে তাকায়।
“ভগবান বুদ্ধ যদি বলেন—‘মায়া থেকে মুক্ত হও’, তাহলে ভালোবাসা কি মায়া নয়?”

সুবোধ মৃদু হেসে উত্তর দেয়,
“ভালোবাসা যদি মুক্তি দিতে জানে, তাহলে সে বন্ধন নয়, সে উপায়।”

এই কথায় আরন্যা চুপ করে যায়। সে জানে, ভালোবাসা যেমন হতে পারে আশ্রয়, তেমনি হতে পারে বিপথগামীও।
তবে সুবোধের ভালোবাসা চাপ নয়, বরং পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।

এভাবেই কেটে যায় আরও কিছু মাস। আরন্যার মা একটু একটু করে সুস্থ হন। একদিন তিনি নিজের হাতে রান্না করে মেয়েকে খাওয়ান, আর বলেন,
“বুদ্ধের কৃপা ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না মা। তুই আমাকে রক্ষা করেছিস।”

সে রাতে, আরন্যা আবার বোধিবৃক্ষের নিচে আসে। পূর্ণিমার আলোয় গাছটা যেন সোনালী আলোয় জ্বলছে।

সে হাঁটু গেড়ে বসে বলে,
“ভগবান বুদ্ধ, আমি বুঝতে পেরেছি। দুঃখ জীবনের অংশ। কিন্তু শান্তি আসে দায়িত্ব নিলে, ভালোবাসলে, ক্ষমা করতে শিখলে।”

তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
জ্যোৎস্না তাকে ভিজিয়ে দেয়। বাতাসে একটা কল্পিত শান্তির পরশ বয়ে যায়, যেন গাছটা নিজেই আশীর্বাদ করছে।


---

বছর তিনেক পরে...

রাঙাচুড়িতে এখন একটা বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আরন্যা সেখানে শিক্ষকতা করে, আর সুবোধ এখন একজন ভিক্ষু—ভন্তে সুবোধানন্দ। সে সংসার ত্যাগ করেছে, কিন্তু আরন্যার প্রতি তার শ্রদ্ধা অপরিবর্তিত।

তারা মাঝে মাঝে দেখা করে, কথা বলে না বেশি, শুধু একে অপরকে নমস্কার জানায়।

আরন্যার কণ্ঠে এখন প্রার্থনা ভেসে আসে—
"বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি"
"ধম্মং সরণং গচ্ছামি"
"সঙ্ঘং সরণং গচ্ছামি"

আর বোধিবৃক্ষের নিচে এখনো পূর্ণিমার রাতে আলো জ্বলে—
আর কেউ একজন নিশ্চুপ বসে থাকে, চুপচাপ নিজের সঙ্গে নিজের সেতুবন্ধ গড়ে চলে।
22 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: