(১)
সন্ধ্যার আলোটা যেন একটু বেশি নরম হয়ে এসেছিল সেদিন। রমনার বৃক্ষঢাকা প্রান্তে একটা বেঞ্চে বসে ছেলেটি বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল, কিন্তু চোখ যেন স্থির হচ্ছিল না কোনো লাইনে। মনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা, গলার কাছটায় ভারী জমাট বেদনা। সে জানে, আজ থেকে প্রতিটি সন্ধ্যা হয়তো বদলে যাবে। এই বেঞ্চ, এই ছায়া, এই পাতা ওল্টানোর শব্দ—সবকিছুই হয়তো আজ শেষ হবে।
ছেলেটার নাম সামিউল। বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল অদ্ভুত ধরনের চুপচাপ, একটু অন্যরকম। পড়াশোনায় ভালো, পরিবারভিত্তিক জীবন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কাব্যিক যন্ত্রণার বাসা বাঁধা ছিল তার হৃদয়ে। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিল সে, তারপর থেকে যেন একটা শূন্যতা তার বুকের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে, যেটা কারও সঙ্গে ভাগ করতে পারেনি সে।
আর ঠিক এই শূন্যতার ভেতরেই এসে একদিন আলোর মতো ঢুকে পড়েছিল মেয়েটা—মেহরিন।
প্রথম দেখা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাসের প্রথম দিন, সামিউল জানালার পাশে বসেছিল। আর মেহরিন পাশের চেয়ারে এসে বসে তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে হেসে বলেছিল, “সরি, একটু বেশি গতি ছিল বুঝি...”
সেই একটুখানি স্পর্শ আর সেই একফোঁটা হাসির আলোর মধ্যেই সামিউল হারিয়ে গিয়েছিল।
মেহরিন ছিল একদম উল্টো স্বভাবের। প্রাণবন্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, সরাসরি, সাহসী। সবাইকে মাতিয়ে রাখার মতো উপস্থিতি ছিল ওর। প্রথম প্রথম ওরা শুধু বন্ধু ছিল। সামিউলের চোখে চোখ রেখে হেসে বলত, “তোমার ভেতর একটা কষ্ট আছে, বুঝতে পারি। কিন্তু কষ্টটা এত সুন্দর করে লুকাও, সেটা দেখে তোমায় দেখে ভালো লাগে।”
সামিউল কিছু বলত না। শুধু তাকিয়ে থাকত।
দিন যেতে লাগল। ক্লাস, গ্রুপ প্রজেক্ট, আড্ডা—সব কিছুতেই মেহরিনের ছায়া থাকত সামিউলের পাশে। একটা সময় এসে ও বুঝে গেল, ও ভালোবেসে ফেলেছে মেহরিনকে। কিন্তু মেহরিন কোনোদিন ভালোবাসা নিয়ে কিছু বলেনি। যেন ওর সমস্ত উষ্ণতা বন্ধুত্বেই আটকে আছে।
একবার সামিউল জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কি কাউকে ভালোবাসিস?”
মেহরিন বলেছিল, “ভালোবাসি। কিন্তু তাকে বলিনি কোনোদিন। বললেই হয়তো সে পালিয়ে যাবে।”
“তুই কেন বলিস না?”
“ভয় হয়।”
সামিউল তখন খুব ধীরে বলে, “তুই চাইলে আমি ভয় কমিয়ে দিতে পারি।”
মেহরিন একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, “তুইই তো আমার ভয়ের কারণ…”
সেদিন থেকেই সামিউল নিশ্চিত হয়ে যায়—মেহরিন বুঝে গেছে তার ভালোবাসা, অনুভব করেছে। কিন্তু পরদিন থেকে মেহরিন হঠাৎ দূরে সরে যায়।
ফোনে উত্তর দেয় না, মেসেজে খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর। ক্লাসে এলে কথা বলে না, চোখে চোখ রাখে না। সামিউল ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায়।
একদিন সে সাহস করে বলল, “তুই আমাকে এড়িয়ে যাচিস কেন?”
মেহরিন একটানা কিছু না বলে বলল, “কারণ আমি যদি তোকে কাছাকাছি রাখি, তোকে ভালোবেসে ফেলব… আর আমি জানি, আমার ভালোবাসা কারও জন্য সুখ আনবে না।”
সামিউল থেমে গেল। তার বুকের ভিতর হাহাকার যেন গর্জে উঠল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
তারপর থেকেই আর মেহরিন স্বাভাবিক হয়নি। কেবল সময় পেরিয়ে গেছে, আর তাদের মাঝখানে জমে গেছে না বলা কথার পাহাড়।
শেষ বর্ষের দিকে হঠাৎ একদিন মেহরিন বলল, “চল, একদিন ঘুরতে যাই। শেষবার। যেমনটা ছোটবেলায় সবাই যায়—বিকেল, নৌকা, বাতাস, নীরবতা...”
সামিউল বুঝেছিল, মেহরিন শেষবারের মতো কিছু মনে রাখতে চাইছে।
ওরা ঢাকার বাইরে গিয়েছিল—আরিচা ঘাটের কাছে। পদ্মার পাড়ে বসে মেহরিন বলেছিল, “তুই আমাকে পছন্দ করিস, আমি জানি। আমিও তোকে করি… অনেক বেশি। কিন্তু আমি কোনোদিন সাহস পাইনি তোকে বলতে।”
“এখন বলছিস?”
“হ্যাঁ। কারণ আজ আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সামি। আমার বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি না বলতে পারিনি।”
সামিউলের সমস্ত শরীর জমে যায়। ঠোঁট কাঁপে, গলায় কোনো শব্দ আসে না।
মেহরিন তার হাতটা ধরে বলে, “আমি তোর সঙ্গে থাকতে পারিনি, সামি। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর ভালোবাসায় আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। আজ আমি যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি, সে কখনো আমার হৃদয়ে ঢুকতে পারবে না। আমি তোকে হৃদমাঝারে রেখেছি… আজীবন।”
সেদিন সামিউল কোনো উত্তর দেয়নি।
সেদিন পদ্মার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখে ওরা। কেউ কাঁদেনি। কেবল দুজন দুজনের দিকে চেয়ে থেকেছে অনেকক্ষণ।
তারপর ফিরে এসেছে, গাড়ির জানালার কাচের ভেতর এক অনন্ত নীরবতা নিয়ে।
পরদিন মেহরিন জানিয়েছিল, তার বিয়ে এক সপ্তাহ পর।
সেই থেকেই সামিউল আজ এই বেঞ্চে বসে আছে। ঠিক সেই মূহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে ও, যেখানে ভালোবাসা শেষ হয় না, কিন্তু হেরে যায় বাস্তবের কাছে।
ঠিক তখনই মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন আসে—"মেহরিন sent you a voice message."
সামিউল কাঁপা হাতে মোবাইলটা কানে তোলে।
"সামি, আমি জানি তোকে না বলার অধিকার আমার নেই। তবুও বলছি—তুই আমাকে ভুলে যা। আমার বিয়ে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মনে রয়ে গেছিস তুই। আমি চাই না, তুই এই বেদনার মধ্যে বাঁচিস। তোকে যদি ভালোবাসি, তবে তোকে মুক্ত করে দিই। প্লিজ, ভালো থাকিস।"
মেসেজ শেষ হতেই, সামিউলের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একটা অশ্রুবিন্দু।
সে জানে, এই ভালোবাসা চিরকাল বুকের মাঝে থাকবে। কেবল অনুভব হবে, প্রকাশ পাবে না। কারণ—
তোমায় হৃদমাঝারে রাখবো... কিন্তু পাশে নয়।
___________________________________
(২)
নতুন ভোরে সূর্যটা উঠে এসেছিল ঠিক আগের দিনের মতোই, কিন্তু সামিউলের কাছে সেই আলো যেন অনেকটাই ম্লান, অনেকটাই ঠান্ডা। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে মেহরিনের সেই শেষ ভয়েস মেসেজের পর। সেই ভয়েসে ছিল আত্মসমর্পণের স্বর, ছিল হৃদয়ভাঙার স্পষ্টতা, আর ছিল এক অদ্ভুত রকম ভালোবাসার উপসংহার।
বিয়ের পরদিন সামিউল তার মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছিল। সে কারো সঙ্গে কথা বলে না, ক্লাসে যায় না, এমনকি বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা করে না। তার ভেতরটা এখন নিস্তব্ধ এক উপত্যকা—যেখানে কিছু জ্বলছে না, কিন্তু ছাই জমে আছে অনেকটা।
ঢাকার ব্যস্ত শহরে গ্রীষ্মের রোদের তাপে পুড়ে যাওয়া ছাদে বসে সে নিজের পুরোনো ডায়েরি খুলে বসেছিল। মেহরিনের লেখা কিছু পুরোনো কাগজ, ছোট ছোট কবিতার লাইন, কিছু চিরকুট—সব সাজিয়ে রেখেছে সে যেন একটা স্মৃতির জাদুঘর বানিয়েছে।
তার ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল—
> "ভালোবাসা মানেই পাশে থাকা নয়...
অনেক সময় ভালোবাসা মানে ছেড়ে যাওয়া।
তোর হৃদয়ে যদি থাকি, তবেই তো আছি...
বাকি সব ছায়া মাত্র।"
এইসব লাইন পড়ে সে প্রতিদিনই যেন আরও একবার মেহরিনকে খুঁজে পায়, আবার হারায়।
ঠিক এমনই এক রাতে, যখন ঢাকার বাতাসটা একটু শীতল হয়ে আসে, সামিউলের দরজায় করাঘাত পড়ে।
সে দরজা খুলে স্তব্ধ হয়ে যায়।
সামনের দড়জায় দাঁড়িয়ে আছে মেহরিন।
কপালে সিঁদুর নেই, কানে ছোট্ট একজোড়া দুল, পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ। চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে নিঃশব্দ।
সামিউল কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর কাঁপা গলায় বলে, “তুই... তুই এখানে?”
মেহরিন চোখ নিচু করে ফিসফিস করে বলে, “আমি পালিয়ে এসেছি... বিয়ে হয়নি আমার।”
ভেতরটা যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। সময় আটকে গেল দুজনের মাঝখানে।
“কি বলছিস তুই? কবে?”—সামিউলের গলা কাঁপছিল।
“সেই রাতেই। যেদিন তোকে ভয়েস মেসেজ পাঠালাম। আমি... আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। রেলস্টেশনে সারা রাত বসেছিলাম। আমার আত্মসম্মান, ভালোবাসা... আমি কাউকে বোঝাতে পারিনি, কিন্তু তোকে ছেড়ে যেতেও পারিনি।”
সামিউল কিছু বলছিল না। তার মুখে ছিল বিস্ময় আর কান্নার প্রতিফলন।
মেহরিন তখন ধীরে ধীরে বলছিল, “আমি জানতাম না কোথায় যাবো। কার কাছে যাবো। শুধু জানতাম, তোকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। আমার বাবা ভীষণ রেগে গিয়েছে, মা চুপচাপ কাঁদছে। আমি আজ এখানে এসেছি, কোনো দাবি নিয়ে না, কোনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে না... আমি এসেছি কারণ আমি তোকে ভালোবাসি।”
সামিউল তখন এগিয়ে এসে মেহরিনের হাত দুটো ধরে বলে, “তুই জানিস, আমি কতটা কষ্টে ছিলাম? তোর কথা না ভেবে একটা রাতও কাটাইনি আমি... তুই চলে গেছিলিস, কিন্তু তোকে হৃদমাঝারে রেখে দিয়েছিলাম... চিরকাল রাখবো বলে।”
তারা দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো শব্দ ছিল না, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—শুধু একে অপরের স্পন্দনের স্বাক্ষর ছিল।
পরদিন সকালে সামিউল সিদ্ধান্ত নেয়—আর গোপনে নয়। এ সমাজ, পরিবার—সবকিছুকে সামনে রেখেই সে মেহরিনকে গ্রহণ করবে। ভালোবাসা যদি সত্যিই শক্তি হয়, তবে তাতে লড়াই করার সাহসও থাকা উচিত।
সেদিনই তারা যায় মেহরিনের বাড়িতে। মেহরিনের বাবা প্রথমে কিছুই বলেন না, কেবল চেয়ে থাকেন তাদের দিকে। শেষে বলেন, “ভালোবাসা যদি পালিয়ে যেতে শেখায়, তবে সে ভালোবাসা নয়। কিন্তু যদি সাহস দেয় সত্যিটা বলার, সামনে দাঁড়ানোর—তবে সেটাই সত্যিকারের সম্পর্ক।”
সামিউল তার পায়ের কাছে বসে পড়ে বলে, “চেষ্টা করব ওর যোগ্য হতে, শুধু একটা সুযোগ দিন।”
বাবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “আজ না হয় দিলাম… তবে সুখী রাখার দায়িত্ব তোমার।”
সেদিন বিকেলে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে, কোনো জমকালো আয়োজন ছাড়াই, সামিউল আর মেহরিন বিয়ের পিঁড়িতে বসে। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনেরা কেউ কেউ চোখ মুছে, কেউ কেউ হাসে, কেউ কেউ অবাক হয়।
কিন্তু সবকিছুর মধ্যে একটা জিনিস স্পষ্ট ছিল—এই দুই হৃদয় অবশেষে এক হয়েছে।
বিয়ের রাতে, ছাদের উপর তারা দুজন বসে ছিল চুপচাপ। ঢাকার বাতাসে তখনও গ্রীষ্মের গন্ধ, কিন্তু মেহরিনের মাথাটা সামিউলের কাঁধে রেখে বলা একটা লাইন সেই মুহূর্তটাকে চিরন্তন করে দেয়—
“আমি জানতাম, শেষ পর্যন্ত তুই আমায় রাখবিই... হৃদমাঝারে নয়, এবার পাশে।”
সামিউল হেসে বলে, “তুই তো আগেই ছিলি আমার হৃদয়ের ভেতর। এখন শুধু হাতে রাখলাম, সারা জীবন ধরে রাখতে…”
জ্যোৎস্না পড়ে ছাদে, বাতাস বইছে ধীরে ধীরে, আর সেই আলো-ছায়ার ভিতর দিয়ে দুটো মানুষ নতুন একটা অধ্যায় শুরু করে দেয়—ভালোবাসার, সাহসের আর প্রতিশ্রুতির।
কারণ—
তোমায় হৃদমাঝারে রেখেছিলাম… এবার পাশে রেখেছি। আজীবন।
___________________________
সমাপ্ত...................................
তোমায় হৃদমাঝারে রাখবো
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
28
Views
5
Likes
0
Comments
0.0
Rating