মুর্শিদাবাদের হরিণডাঙ্গা গ্রামের একটা ছোট্ট কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে দশম শ্রেণির ছাত্র রাহাত। তার হাতে স্কুলব্যাগ, চোখে স্বপ্ন — কিন্তু বুকের ভিতর দোটানায় কাঁপছে মন।
রাহাতের পরিবার গরিব। বাবা জাহাঙ্গীর মিয়া একজন তাঁতের কারিগর। সারাদিন তাঁতের ঘুং-ঘুং শব্দে মেশে পেট চালানোর সংগ্রাম। মা রহিমা বেগম গ্রামেরই প্রাথমিক স্কুলে রান্নার কাজ করেন। তবু রাহাতের পড়াশোনায় খামতি রাখেননি কখনও।
রামাদান চলছে। আজ রমজানের পনেরোতম দিন। রাহাত প্রতিদিন রোজা রাখে, মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ে, আর কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে সন্ধ্যার পর।
কিন্তু এই রমজানটা আলাদা। এইবার ক্লাস টেনের ফাইনাল পরীক্ষার ফল বের হবে ঈদের ঠিক আগে। আর গ্রামের একমাত্র উর্দু মাধ্যম মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ কাসেম সাহেব রাহাতকে বলে দিয়েছেন,
“তুই ভালো রেজাল্ট করলে কলকাতার দারুল উলুমে স্কলারশিপে পাঠাবো তোকে। ইলমের দরজা খুলে যাবে রাহাত!”
রাহাত জানে, এটা তার জীবনের মোড় ঘোরানোর সুযোগ।
একদিন ইফতারের কিছু আগে রাহাত বাড়ি ফিরছিলো মাদ্রাসা থেকে। হঠাৎ সে দেখতে পেলো, গ্রামের মোড়ের কাছে কিছু ছেলে এক বৃদ্ধ হিন্দু মানুষটিকে (হরিপদ কাকু) নিয়ে হাসাহাসি করছে।
“ওর হাত নোংরা!”
“ও তো গরুর পুজো করে!”
রাহাত থমকে গেলো। সে জানে ইসলাম কী বলে— ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে ন্যায়পরায়ণ এবং দয়ালু।’ সে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেলো।
“ভাইরা, হরিপদ কাকু আমাদের প্রতিবেশী। রমজান মাসে আমাদের দায়িত্ব অন্য ধর্মের লোকদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, অপমান নয়।”
ছেলেরা প্রথমে রেগে গেলো, কিন্তু রাহাতের চোখে যে আত্মবিশ্বাস, সেই চোখে ভয় ছিল না, ছিল আলোর ছায়া। তার যুক্তির সামনে তারা চুপ করে গেল।
হরিপদ কাকু চোখে জল নিয়ে বললেন, “তুই আল্লাহর বাছা রে!”
সেই রাতেই রাহাত তার বাবাকে সব বলল। বাবা মুচকি হেসে বললেন,
“এই তো আসল ইসলাম। শুধু নামাজ বা রোজা নয়, মানুষের প্রতি দয়া দেখানোই আল্লাহর কাছে বড় ইবাদত।”
পরদিন রাহাত এক নতুন দায়িত্বে নিজেকে আবিষ্কার করলো। ইফতারের ঠিক আগে সে কিছু খেজুর, মুড়ি আর চিনি নিয়ে গেলো হরিপদ কাকুর বাড়িতে। কাকু ভেতর থেকে বললেন,
“এত কষ্ট করে এসেছিস?”
রাহাত মুচকি হেসে বলল,
“আজ আমার আম্মু বলেছে, রমজানে দান করলেই নেকি হয়। কাকু আপনি আমার এই নেকির সাথী হোন।”
হরিপদ কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন,
“তোর মত ছেলে থাকলে এই দেশ ভাঙবে না রে বাবা, জোড়া লাগবে।”
রাহাত কিছু না বলে মুচকি হেসে ফিরে গেলো মসজিদের দিকে।
ঈদের ঠিক আগের দিন ফল প্রকাশ হলো। রাহাত তার স্কুলে প্রথম হয়েছে। হাফেজ কাসেম সাহেব তাকে ডেকে বললেন,
“তোর মতো ছাত্রই আমাদের ভবিষ্যত। তুই শুধু আলেমই না, মানুষও হবি, ইনশাআল্লাহ।”
ঈদের দিন সকালে গ্রামের ঈদগাহে নামাজের পর রাহাত যখন সকলের সঙ্গে কোলাকুলি করছিল, হরিপদ কাকুও এসেছিলেন। তিনি দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে মৃদু হাসি।
রাহাত এগিয়ে গিয়ে তার হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে বলল,
“আপনিও আমার পরিবারের একজন, কাকু। ঈদ মোবারক!”
হরিপদ কাকুর চোখ ছলছল করে উঠলো। তিনি কিছু বললেন না, শুধু হাতটা রাহাতের মাথায় রেখে দোয়া করলেন।
ঈদের সেই সকালে রাহাত জানলো, ইসলাম কেবল ইবাদতের নাম নয়, মানবতার এক বিশাল দরজা। আর সে দরজা শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, সবার জন্য খোলা।
রাহাতের গল্প
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
39
Views
8
Likes
0
Comments
0.0
Rating