সুলতানা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
নাম তার সুলতানা আক্তার। কিন্তু শহরের গলিতে, পুরোনো সেই টিনচালার ঘরে কেউ তাকে নাম ধরে ডাকে না। কেউ বলে “ও মেয়েটা”, কেউ বলে “ভালো মেয়ে, একটু চুপচাপ”। কিন্তু কেউ জানে না, এই মেয়েটা একদিন সমাজের সমস্ত নিয়মকানুনের মুখে ঠাস করে জবাব দেবে—নীরব ভাষায়, চোখ তুলে তাকিয়ে।

সুলতানার জন্ম হয়েছিল এক অভাবী সংসারে। বাবা রিকশাচালক, মা গৃহপরিচারিকা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সুলতানা—তাই তাকে সবাই বলে “তুই মেয়ে না, তুই ছেলেই।” স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি সুলতানা বিকেল বেলায় বাড়িতে সেলাই করত, টিউশন করত। কিন্তু তার চোখে ছিল অন্য কিছু—সাধারণ জীবনের বাইরে যাওয়ার এক স্বপ্ন।


---

ক্লাস টেনের এক সকালে, জীবনের প্রথম প্রতিবাদ করে সুলতানা। তার কাকা এসে প্রস্তাব দেন—“তোর বাবা তো আর খরচ চালাতে পারবে না, একটা ভালো পরিবার পেয়েছি। মেয়ে মানুষ, বয়স তো হয়েছে...বিয়ে দিলে বাঁচবে।”
সুলতানা সেই রাতে মাকে চিঠি লিখে চলে যায়। চলে যায় ঢাকায়—এক এনজিওর হোস্টেলে আশ্রয় নিয়ে ভর্তি হয় সরকারি মহিলা কলেজে।

সবাই ভাবে, এই মেয়ে নিশ্চয় একদিন ভেঙে পড়বে। কিন্তু না—সুলতানা নিজের খরচ নিজে চালায়। সকালবেলা গার্মেন্টসে কাজ করে, বিকেলে ক্লাস করে, রাতে হোস্টেলের ছাত্রীদের পড়ায়।

তবে শুধু নিজের জীবন সাজাতেই সে থেমে থাকেনি। তার চোখ পড়েছিল সেইসব গার্মেন্টসের মেয়েদের দিকে যারা একবারও স্কুলের গেট পেরোয়নি।

তাদের জন্য সুলতানা শুরু করে “আলোঘর”—একটা রাতের স্কুল, যেখানে গার্মেন্টসের মেয়েরা কাজ শেষে এসে এক ঘণ্টা পড়াশোনা করে, বাংলা-হিসাব-ইংরেজি শেখে।

সুলতানা নিজেই ছিল প্রধান শিক্ষক, বন্ধু, ও কখনো মায়ের মতো। একসময় সে বোঝে, এই আলোঘর শুধু পড়ার জায়গা না, এটা একটা আশ্রয়—যেখানে তারা বলে, “আপা, আমি আর চাকরির কথা ভাবছি না, আমি এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাই।”


---

এই কাজ তার জীবন পাল্টে দেয়। একদিন ব্র্যাক-এর এক কর্মকর্তার নজরে আসে সুলতানার স্কুল। তার কথায় সাড়া দিয়ে এক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সে—“গ্রামীণ উদ্যোগে নারী নেতৃত্ব”—আর জিতে যায় পুরো দেশের সেরা উদ্ভাবনীর স্বীকৃতি।

তাকে ডাকা হয় জাতীয় সংসদে, তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি বানায়, বিদেশি পত্রিকায় শিরোনাম হয়—
“The Girl Who Built a Night School”

সুলতানা সেই অনুষ্ঠানে মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমার কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না। শুধু চেয়েছিলাম কেউ যেন আর আমাকে বলে না—‘তুই মেয়ে, কিছু করতে পারবি না।’”

তার কথায় কারও চোখে জল আসে, কারও বুক গর্বে ফুলে ওঠে।


---

আজ সুলতানা ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোশ্যাল ওয়ার্ক বিভাগে পড়াচ্ছে। কিন্তু প্রতি শুক্রবার সে এখনো আলোঘরে যায়। নতুন নতুন মেয়েরা এখন সেখান থেকে পাশ করে সরকারি চাকরি পাচ্ছে, কেউ নার্স হচ্ছে, কেউ ছোট ব্যবসা খুলছে।

একদিন এক পুরনো ছাত্রী এসে বলে,
“আপা, আমি এখন দুইটা মেয়ের মা। ওদের নাম রেখেছি—আলো আর সুলতানা।”

সুলতানা চুপচাপ হাসে। মুখে কিছু বলে না। কিন্তু তার চোখে তখন বিজয়ের সেই আগুন যা কোনো খবরে আসে না, কোনো মাইকে বাজে না—
শুধু একটি মেয়ের নীরব বিপ্লবের জ্বলন্ত চিহ্ন হয়ে থাকে।


---

গল্পের শেষে শুধু একটা লাইন লেখা থাকে:

“সুলতানা কোনো সিংহাসনে বসে না—তবে হাজার মেয়ের হৃদয়ে সে চিরদিন রানি হয়ে থাকে।”
23 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: