সেইদিন ঝড় এসেছিল। একেবারে এপ্রিলের শেষ দিকে। মাঠের ধানগাছ লুটিয়ে পড়েছিল মাটিতে, আকাশটাও যেন লাল হয়ে গিয়েছিল। মা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন, আর আমি ভেতরে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম কেমন করে বাবা শেষবারের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
আমার বয়স তখন নয়। মা বলতেন, আমি অনেক শান্ত ছেলে। চুপচাপ বসে থাকতাম। কিন্তু সেদিন, সেদিন কেন জানি, আমি শুধু চিৎকার করে বলেছিলাম—
“বাবা, তুমি কই যাও?”
বাবা তখন পেছন ফিরে তাকিয়েছিলেন। চোখে ছিল আলো, যেন আগুন, যেন দৃঢ়তা।
তিনি শুধু বলেছিলেন—
“আমি যাই, আমার দেশ ডাক দিছে।”
তারপর একটা ঠাণ্ডা চুমু দিয়েছিলেন আমার কপালে। সেই চুমু এখনো শুকায়নি ভাইয়া, এখনো আমি মাঝে মাঝে কপালে হাত বুলিয়ে দেখি, যদি ফিরে পাই কিছু স্পর্শ।
বাবা তখন মুক্তিযোদ্ধা হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি স্কুলে গণিতের শিক্ষক ছিলেন, গ্রামের সবচেয়ে গম্ভীর মানুষ। হাঁটতেন ধীর পায়ে, কথা বলতেন মাপজোক করে, আর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করতেন রাতের খাবারে ডাল পাতলা হলে।
কিন্তু সেই মানুষটিই একদিন বললেন—
“আমি অস্ত্র ধরবো। আমি না গেলে ওরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ হতে দেবে না।”
মা কিছু বলেননি সেদিন, কেবল চুপচাপ বাবার জুতোজোড়া ঘষে মুছে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আর চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিলেন—
“বেঁচে ফিরিস।”
---
যুদ্ধ শুরু হল। চারপাশে গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ, খালি ঘর, ভাঙা রাস্তা—সবকিছুই বদলে গেল। বাবা চলে যাবার পর বাড়ির উঠোনটা যেন বেদনার মাঠ হয়ে গেল।
মা দিনে দিনে চুপ হয়ে যেতে লাগলেন। আগের মতো গল্প বলতেন না, হাসতেন না। শুধু প্রতিদিন বাবার পাঞ্জাবি ধুয়ে রোদে মেলে দিতেন। কিসের আশায় জানি না।
প্রতিদিন আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। যদি হঠাৎ দেখি বাবার ছায়া দেখা দিল, যদি সে দৌড়ে এসে আমাকে কোলে তুলে নেয়।
একদিন এক মুক্তিযোদ্ধা এলেন বাড়িতে। চোখে মুখে ধুলো, হাতে ব্যান্ডেজ।
তিনি বললেন,
“আমরা কুমিল্লা ফ্রন্ট থেকে ফিরছি। মাস্টার সাহেব অনেক সাহসী ছিলেন।”
মা তখন জিজ্ঞেস করলেন—
“আমার স্বামীর খবর জানেন?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
“তিনি আমাদের পেছনে ছিলেন… তারপর একবার গোলাবর্ষণে ধোঁয়ার মাঝে উনাকে হারিয়ে ফেলি। খুঁজে পাইনি আর।”
আমি তখনও বুঝতে পারিনি এর মানে কী। কিন্তু মায়ের মুখ দেখে বুঝেছিলাম, কিচ্ছু ভালো হয়নি।
---
যুদ্ধ শেষ হল। বিজয় এল। মানুষ আনন্দে পাগলপ্রায়। লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে উঠোনে, বাঁশঝাড়ে। কিন্তু আমাদের বাড়িতে কেবল নিস্তব্ধতা।
আমরা কেউ কাঁদি না, কেউ হাসিও না।
মা শুধু বলতেন—
“তোর বাবা ফিরবে। ও কথা দিয়েছিল।”
আমি দিন গুনতাম। একদিন, দুইদিন, এক মাস, তিন মাস, এক বছর।
আমার বন্ধুদের বাবারা ফিরেছে। কেউ কেউ বিকলাঙ্গ, কেউ চোখ হারিয়েছে, কিন্তু ফিরেছে।
আমার বাবা?
কেউ জানে না কোথায় গেলেন। মৃত না জীবিত—কোনো তালিকায় নাম নেই।
এলাকার মানুষ মুখে মুখে বলত—
“ওরে, মাস্টার সাহেব আর ফিরবে না।”
“ওর বউ এখন বিধবা… নতুন জীবন গড়ুক।”
“মরে গেছে নিশ্চিত, না হলে এতদিনে খবর আসতো।”
এইসব কথা শুনে আমি একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করলাম—
“মা, বাবা কি ফিরবে না?”
মা তাকালেন না, শুধু বললেন—
“তুই খালি এই কথা বলিস ক্যান রে?”
আমি বললাম—
“কারণ আমি এখনো স্বপ্নে দেখেছি, বাবা আসছে। সে আমার হাত ধরে বলছে—তুই বড় হ। আমি তোর জন্য বেঁচে থাকি।”
মা তখন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলেন।
---
পাঁচ বছর পর, একদিন চিঠি এল। একটা কাগজ, তাতে লেখা—
> “আমরা বধ্যভূমি খুঁজে পেয়েছি। কিছু মানুষের হাড্ডি, কিছু চশমা, কিছু পাঞ্জাবি পাওয়া গেছে। আপনি এসে দেখুন, চেনেন কিনা।”
আমরা গিয়েছিলাম। মা কাঁপতে কাঁপতে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা রুমাল তুলেছিলেন। তাতে অক্ষর কাটা—“M.R.”
মোখলেসুর রহমান।
আমার বাবার নাম।
সেই রুমাল দেখে মা আর দাঁড়াতে পারেননি। বসে পড়েছিলেন মাটিতে। আমি তখনও কিছু বুঝিনি। কিন্তু পরের দিন মায়ের মুখে প্রথম শুনেছিলাম—
“তোর বাবা আর ফিরবে না।”
আমি তখন জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম।
“তাহলে আমি কার অপেক্ষা করি মা?”
“আমি কার কপালে বাবার হাত বুলিয়ে বলি—দেখো আমি কত ভালো পড়ছি?”
“আমি কাকে বলি—আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা?”
মা কিছু বলেননি। শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন—
“তোর বাবা ফিরবে না। কিন্তু সে এই মাটির সাথে মিশে আছে। তুই যখন হাঁটবি, কথা বলবি, তোর ভিতরে তোর বাবাই থাকবে।”
---
আজ আমি বড় হয়েছি।
বাবার ছবিটা এখনো আমাদের ঘরের এক কোণে টাঙানো। তার মুখে হাসি, চোখে চশমা, আর পাঞ্জাবির পকেটে সেই কলম—যেটা দিয়ে তিনি আমাদের দেশের ইতিহাস লিখতে চেয়েছিলেন।
মা বেঁচে নেই। তিনি মারা যাবার আগে বলেছিলেন—
“তোর বাবার জন্য অপেক্ষা করে জীবন কাটিয়ে দিলাম। কষ্ট হয়নি, কারণ আমি জানি সে মরেনি। সে তো দেশের জন্য বেঁচে আছে।”
আমি এখন স্কুলে পড়াই। বাবার মতো।
প্রতিদিন আমি কোনো না কোনো ছাত্রকে প্রশ্ন করি—
“তোমার স্বপ্ন কী?”
আর মনে মনে বাবাকে বলি—
“তুমি ফিরো নাই ঠিকই, কিন্তু আমি তোমার পথেই হাঁটি।”
আজও মাঝেমাঝে রাতে আমি চমকে ঘুম ভেঙে উঠি, জানালায় তাকাই।
একটুও আশায় কমতি হয় না।
মন বলে—
“হয়তো বাবা একদিন ফিরবে… পেছন ফিরে তাকাবে… আর বলবে—আমি তোকে কথা দিয়েছিলাম।”
বাবা কি ফিরবে না?
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
21
Views
2
Likes
0
Comments
0.0
Rating