জ্বীন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাত তখন তিনটার কাছাকাছি। পুরো গ্রাম নিঃস্তব্ধ। কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার কণ্ঠে যেন অদ্ভুত এক বিষাদের সুর বাজছে। চন্দ্রিমা গ্রামের এক কোণায়, তালুকদারদের পুরনো বাড়িটা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়েছে, জানালাগুলোর কাচ ভাঙা, মেঝেতে শ্যাওলা জমে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, প্রতিদিন রাত হলেই বাড়িটার কিছু একটা যেন জেগে ওঠে।

লোকেরা বলে, ওখানে এক জ্বীন থাকে।


---

তামিম শহর থেকে সদ্য গ্রামে ফিরেছে। তার দাদু, মরহুম সিরাজ তালুকদার ছিলেন চন্দ্রিমার প্রভাবশালী জমিদারদের একজন। মৃত্যুর আগে তার একটাই শর্ত ছিল, “তুই আমার মৃত্যুর একবছরের মাথায় এই বাড়িতে একরাত থাকবি। থাকবি, দেখবি, আর জানবি, কী রেখে গেলাম আমি।”

তামিম বিজ্ঞান পড়েছে, যুক্তিতে বিশ্বাসী, ভূত-টুত এসবকে সে ডাহা মিথ্যে বলে মনে করে। তাই দাদুর শর্ত মানতে কোনো দ্বিধা করেনি।

সে সন্ধ্যাবেলা নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে তালুকদার বাড়ির ভেতরে ঢোকে। একটা বড় চাবি দিয়ে সদর দরজা খুলতেই ধুলোর ঘ্রাণ, পুরনো কাঠের গন্ধ আর সময়ের স্তব্ধতা যেন একসাথে তাকে আঘাত করল। কাঠের মেঝেতে পা দিতেই খড়খড় আওয়াজ। দোতলায় উঠে বাঁদিকে দাদুর ঘরে ঢুকে একটা পুরনো খাটে ব্যাগ রাখল সে। তারপর জানালার ধারে বসে চা খেতে খেতে গ্রামের রাত দেখতে লাগল।

কিন্তু রাত যতই গাঢ় হতে থাকল, বাতাস যেন ততই ভারী হয়ে উঠল।


---

রাত ১টা।
ঘরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। জানালাটা নিজে থেকেই খুলে গেল কিচ কিচ করে। বাতাসের ঝাপটায় পর্দা উড়ছে। তামিম জানালাটা বন্ধ করতে উঠল, তখনই চোখে পড়ল—অন্ধকার উঠোনে একটা সাদা কাপড় পরা অবয়ব দাঁড়িয়ে। পরিষ্কারভাবে মুখ দেখা যাচ্ছে না।

সে চিৎকার করে উঠল, “কে সেখানে?”

কোনো উত্তর নেই।

তামিম সাহস করে নিচে নামল। টর্চ হাতে নিয়ে উঠোনে গেল।
কিন্তু কেউ নেই।

বুকে ধকধক করছে তার, কিন্তু সে নিজেকে বোঝাল, "আহ, এটা চোখের ভুল। হয়তো কোনো গাছের ছায়া ছিল।"

সে আবার ঘরে ফিরে গেল। দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। ঠিক তখনই, দোতলার বারান্দা দিয়ে কেমন যেন মৃদু মৃদু কান্নার শব্দ আসতে লাগল।


---

রাত ৩টা।
তামিমের ঘুম ভেঙে গেল। কে যেন খুব ধীরে তার দরজার গায়ে হাত বুলাচ্ছে। সসসসস... শব্দ হচ্ছে।

সে উঠে দরজা খুলতেই—
কেউ নেই। শুধু করিডোরে একটা শাড়ির কোণা মিলিয়ে যাচ্ছে।

তামিম দৌড়ে গেল, কিন্তু কিছুই পেল না। এক মুহূর্তে তার মনে হলো—হয়তো দাদু ঠিকই বলেছিলেন।

সে দাদুর ঘরে ফিরে এল, আর খাটের পাশে রাখা পুরনো কাঠের ড্রয়ার খুলল। একরকম অজানা তাড়নায় যেন হাত পড়ল এক গোপন খামের ওপর।

ভেতরে ছিল একটা চিঠি:

> “তামিম,
যদি এই চিঠি পড়িস, তবে বুঝে নিস—তুই আমার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার খুঁজতে এসেছিস। কিন্তু যা রেখে গেছি, তা সম্পদ না। এটা এক অভিশাপ।
৪৭ সালে, যখন দেশভাগের সময় হাজারো পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছিল, আমি এক রাতে এক মেয়েকে এই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম। নাম ছিল জয়নব। চোখে দুঃখ, মুখে নীরবতা। আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু সমাজ মানেনি, আমার স্ত্রী মানেনি। এক রাতে তারা ওকে তুলে নিয়ে গেল... বলল, সে জ্বীন, সে অপবিত্র। ওকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এই বাড়ির পেছনের বাগানে।
তারপর থেকেই, বাড়িটার আকাশে এক কান্না ঝুলে থাকে। আমি চেয়েছিলাম, তুই একরাত থাকবি, আর অনুভব করবি, কতটা অন্যায় হয়েছিল। জানবি, সত্যিকার ভয় আসলে মানুষের নির্মিত। জ্বীন নয়, মানুষই ভয়ংকর। কিন্তু তুই যদি ওর সামনে দাঁড়িয়ে ওর শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারিস—তবেই মুক্তি মিলবে আমার আত্মার।
—দাদু”




---

তামিম বসে রইল অনেকক্ষণ। চোখে জল চলে এসেছে। সেই পেছনের বাগানে গিয়ে দাঁড়াল। রাতের আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে সোঁদা গন্ধ।

সে বলল, “জয়নব... আমি জানি, তোমার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। আমি তামিম, সিরাজ তালুকদারের নাতি। আমি এসেছি ক্ষমা চাইতে... তোমার জন্য নয়, আমাদের জন্য।”

পেছন থেকে হঠাৎ শাড়ির আচলের ঝাঁপটা। সে ঘুরে তাকাল।

একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে—দীর্ঘ চুল, মলিন সাদা শাড়ি, চোখে এক অপার বিষণ্ণতা। কোনো ভয় নেই তামিমের চোখে।

সে চুপচাপ বলল, “তোমার প্রাপ্য ছিল ভালোবাসা, সম্মান—not আগুনে পুড়ে যাওয়া।”

মেয়েটি কোনো কথা বলল না, কিন্তু চোখে টলমল জল। ধীরে ধীরে সে মাটির ভেতর মিলিয়ে গেল। বাতাস হালকা হয়ে গেল। আকাশ পরিষ্কার।

তামিম বুঝল—বাড়িটার অভিশাপ শেষ।


---

তিন মাস পর।

তামিম গ্রামে স্কুল খুলেছে। নাম দিয়েছে “জয়নব মেমোরিয়াল বিদ্যাপীঠ”। বাড়িটাকে নতুন করে মেরামত করে বাচ্চাদের জন্য ব্যবহার করছে।

লোকেরা এখনো বলে, রাতে যেন হালকা এক সাদা শাড়ির ছায়া স্কুলের করিডোরে হেঁটে বেড়ায়।
কিন্তু কেউ আর ভয় পায় না। কারণ জানে, সে রাগী নয়, সে অভাগা।

তাকে মানুষ চিনতে পারেনি। এখনো অনেক “জ্বীন” আমাদের আশেপাশেই আছে—কারণ সমাজ আজও দ্যাখে না, বোঝে না, আর ভালোবাসতেও শেখেনি।
33 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: