স্বপ্ন ডানা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পুবাইলের ছোট একটা স্কুল—আলোকধারা উচ্চবিদ্যালয়। নামটা যত আলোকিত, স্কুলটা ততটা না। টিনের চাল, ভাঙা বেঞ্চ, আর লাইব্রেরিতে মাত্র ছাব্বিশটা বই। কিন্তু এখানকার শিক্ষক হাসান স্যার সবসময় বলতেন,
“বই না থাকলে কাগজে স্বপ্ন লিখে পড়ো, আর স্বপ্ন যদি বড় হয়, তাহলে শূন্য থেকেও শুরু করা যায়।”

এই কথাটা মন থেকে বিশ্বাস করত ক্লাস নাইনের ছয়জন ছাত্রছাত্রী—রিদা, সিফাত, তামান্না, মারুফ, জান্নাত আর হিমেল। তারা সব সময় ভাবত, “আমরা শুধু পড়ে পাশ করব, সেটা তো অনেকেই করে। কিন্তু যদি এমন কিছু করতে পারি, যাতে আমাদের স্কুল, আমাদের এলাকাটা বদলে যায়?”

একদিন রিদা স্কুলে বলল,
“আমরা সবাই এত কষ্ট করে পড়ি, কিন্তু আমাদের গ্রামের কেউ জানেই না কীভাবে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হয়, কীভাবে স্কলারশিপ পাওয়া যায়। শহরের ছেলেমেয়েরা এসব শিখে যায় ক্লাস সেভেনে, আর আমরা জেনে উঠি না ক্লাস টেনেও। যদি আমরা একটা প্রজেক্ট করি—'শিক্ষার সেতু', যেখানে আমরা নিজেরাই গ্রামের ছোট স্কুলগুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের এইসব শেখাই?”

প্রথমে সবাই অবাক, তারপর ধীরে ধীরে রাজি হয়ে গেল। তারা নিজেরাই পুরনো ফোন, ল্যাপটপ জোগাড় করল, রাতে ইউটিউব ঘেঁটে স্কলারশিপ, এক্সেল, গুগল ফর্ম শেখার ভিডিও দেখল। এমনকি একবার স্কুল ছুটির পরে হাটে গিয়ে রিকশা চালিয়ে টাকাও জোগাড় করল ছাপার খরচের জন্য।

তারা সপ্তাহে একদিন করে আশপাশের গ্রামের স্কুলে যেত, সেখানে দশটা-বারোটা ক্লাস নিত। প্রথমদিকে তাদের নিয়ে হাসাহাসি করত অন্যরা। “স্কুলের পোলাপান গাইড না বানিয়ে ক্লাস নিচ্ছে?”
কিন্তু একমাসের মধ্যেই বদল আসে। এক গ্রামের স্কুলে ওদের পড়ানো দেখে জেলা শিক্ষা অফিসার নিজেই এসে বলেন,
“তোমরা যদি চাই, আমি এটা জেলাজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারি। তোমরা তো শিক্ষক না, কিন্তু তোমাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা আছে।”

ওরা তখন একটা নাম ঠিক করল নিজেদের দলের—
“স্বপ্ন ডানা”।
লগো বানাল হিমেল, যেখানে একটা খোলা বই থেকে উড়ে যাচ্ছে রঙিন পাখির পাল।

তাদের কাজ এতটাই আলোচনায় আসে যে, একদিন ঢাকা থেকে একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক আসে তাদের ইন্টারভিউ নিতে। টিনশেড স্কুলের ছোট ক্লাসরুমেই দাঁড়িয়ে ক্যামেরার সামনে রিদা বলে,
“আমরা শুধু নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে চাই না, আমরা চাই—গ্রামের একটা বাচ্চাও যেন গুগলে সার্চ করতে জানে, জানে তার পড়ার সুযোগ আছে।”

সেই সাক্ষাৎকার ভাইরাল হয়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষক, এনজিও, এমনকি প্রবাসী বাঙালিরাও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

এবছরের শিক্ষার্থীদের জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় “স্বপ্ন ডানা”-র নাম আসে। তারা “জাতীয় উদ্ভাবনী শিক্ষার্থী পুরস্কার” পায়। পুরস্কার নিতে ঢাকায় যখন যায়, তখন স্টেজে মন্ত্রী বললেন,
“এই ছেলেমেয়েরা আমাদের শেখায়—নেতৃত্ব ক্লাসরুম থেকে শুরু হয়, শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, দেশের জন্য।’’

পুরস্কার নিতে গিয়ে মারুফ বলে,
“আমরা আমাদের গ্রামের ছোট ছোট ভাইবোনদের বলি—তোমরা দরিদ্র হতে পারো, কিন্তু তোমাদের স্বপ্ন দরিদ্র হতে পারবে না।”


---

আজ “স্বপ্ন ডানা” শুধু একটা স্কুলের ছয়জনের সংগঠন না—এটা এখন এক সামাজিক আন্দোলন। বাংলাদেশের ত্রিশটিরও বেশি স্কুলে তারা তাদের মডেল চালু করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালের বড় স্কুলগুলোও তাদের অনুরোধ করছে প্রশিক্ষণের জন্য।

তাদের স্কুলে নতুন একটা ভবন তৈরি হচ্ছে এখন, নাম রাখা হয়েছে—স্বপ্ন ডানা ভবন। লাইব্রেরিতে এখন হাজারের বেশি বই। আর হাসান স্যার প্রতিদিন সেই পুরনো লাইনের মতো বলেন,
“স্বপ্ন শুধু চোখে না, কাজে রাখতে হয়। আর যারা সাহস করে শুরু করে, তারাই উড়তে শেখে।”

গল্পের শেষে শুধু একটা বাক্য লেখা থাকে—

"তারা শুধু ভালো রেজাল্ট করেনি, তারা ভালো ইতিহাস তৈরি করেছে।"
27 Views
2 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: