পঞ্চগড় সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরনো লাইব্রেরির পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলেন একজন মানুষ। মাথার চুলে সাদার ছাপ, কাঁধে ধুলোপড়া ক্যানভাস ব্যাগ, চোখে ভারী চশমা। তাঁর নাম কাঞ্চন কুমার বনিক। আজ তাঁর জীবনের একটি বড় দিন, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
আজ তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিন। ৩৯ বছর আগে তিনি এই স্কুলেই প্রথম ক্লাস নিয়েছিলেন, আর আজ সেই একই মাঠে হচ্ছে তাঁর বিদায় অনুষ্ঠান। ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা: “প্রিয় শিক্ষক কাঞ্চন কুমার বনিক স্যারের বিদায় উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান”।
ঘণ্টা বাজছে না, ছাত্রদের হৈচৈ নেই। বর্তমান ছাত্রদের চেয়ে আজ স্কুল প্রাক্তন ছাত্রদের উপস্থিতিতে মুখর। কিন্তু কাঞ্চন স্যারের চোখ একটানা মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন তিনি কাউকে খুঁজছেন।
হ্যাঁ, তিনি খুঁজছেন একজনকেই—আতিক আহমেদকে।
২০০৭ সালের কথা। নবম শ্রেণির এক ছাত্র আতিক। সে ছিল মেধাবী, কিন্তু দুরন্ত। ক্লাসে হঠাৎ হেঁসে উঠা, টিচারের পেছনে কাগজ ছোড়া, এমনকি মসজিদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বানরভঙ্গিমায় গান গাওয়া—সব মিলিয়ে পুরো স্কুলের মাথাব্যথা ছিল সে। কিন্তু কাঞ্চন স্যার তাকে অন্যভাবে দেখতেন।
একদিন বাংলা ক্লাসে হঠাৎ কাঞ্চন স্যার ক্লাস থামিয়ে বললেন, “আতিক, তুমি জানো তুমি হতে পারো অসাধারণ। কিন্তু তুমি নিজেই নিজের প্রতিভাকে ধ্বংস করছো।”
আতিক সেদিন হেসে বলেছিল, “স্যার, প্রতিভা দিয়ে চাকরি মেলে না।”
স্যার কোনো উত্তর দেননি, শুধু তাকিয়ে ছিলেন ছেলেটার চোখের দিকে। পরদিন আতিক স্কুলে এসে দেখে, তার টেবিলের ওপর একটি চিঠি রাখা। ছাপার অক্ষরে নয়, হাতে লেখা—
“প্রিয় আতিক,
জীবনে অনেক কিছু হারানো যায়, কিন্তু যদি তুমি নিজের ওপর বিশ্বাস হারাও, তবে সবই শেষ। তুমি শুধু ভালো ছাত্র না, তুমি হতে পারো একজন ভালো মানুষ। নিজের আলস্য আর দুষ্টামির নিচে যে আগুন লুকিয়ে আছে, আমি তা দেখতে পাই।
ভালো থেকো।
– কাঞ্চন স্যার”
চিঠিটা আতিক তার বাংলা খাতার ভাঁজে রেখে দিয়েছিল। তখন হয়তো গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু সময়ের সাথে সেই চিঠিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
আতিক পরবর্তীতে কলেজে ভর্তি হয়, বিশ্ববিদ্যালয় পার করে, আর একসময় বিসিএস ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পায়। আজ সে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তার অফিসে মলমল পর্দা, এসি, রিসিপশনিস্ট—সব আছে। কিন্তু একটা পুরনো চিঠি এখনো সে আগলে রাখে, যেমন আগলে রাখে নিজের শিকড়।
কত বছর হয়ে গেছে স্যারের সঙ্গে দেখা হয়নি। স্কুল বদলে গেছে, শহর বদলে গেছে, কিন্তু কাঞ্চন স্যারের প্রতি সেই ঋণ মেটেনি।
আজ সকালে সহকর্মী একজন জানাল, “আপনার স্কুলের স্যার কাঞ্চন বনিক আজ অবসরে যাচ্ছেন।”
সব কাজ ফেলে আতিক রওনা দেয় পঞ্চগড়ের পথে। নিজের সরকারি গাড়ি নিয়ে, সাথে এক ব্যাগ উপহার—কিন্তু তার চেয়েও বেশি, নিজের হৃদয়ের ভেতরে জমে থাকা বহু বছরের শ্রদ্ধা।
বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে মাঠে অনুষ্ঠান চলছিল। বক্তৃতা, ফুলের তোড়া, চা-স্ন্যাকস, সম্মাননার বন্যা। তবু কাঞ্চন স্যারের মুখে সেই কাঙ্ক্ষিত হাসি ছিল না। যেন তার কোনো অপূর্ণতা থেকে গেছে।
ঠিক তখনই স্কুলের পেছনের গেট দিয়ে ঢুকে পড়ে একটি কালো গাড়ি। সবার চোখ সেদিকে। গাড়ি থেকে নামে আতিক আহমেদ।
হাঁটা শুরু করে মঞ্চের দিকে, আর কাঞ্চন স্যারের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।
“স্যার,”—মঞ্চে উঠে আতিক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে—“আজ আমি ইউএনও, কিন্তু আপনাকে ছাড়া আমি কিছুই না। আপনি আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন, যে চিঠিটা আমাকে বাঁচিয়েছে। আপনি আমাকে পড়িয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস, আপনি শিখিয়েছিলেন মর্যাদা।”
পুরো স্কুল চুপচাপ শুনছে।
“স্যার, আপনি অবসর নেননি। আপনি প্রতিটি ছাত্রের ভেতরে আজও বেঁচে আছেন। তাই আমি আজ এই স্কুলে আপনার নামে একটি স্কলারশিপ চালু করছি—‘কাঞ্চন কুমার বনিক শিক্ষা বৃত্তি’। প্রতিবছর যেকোনো দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্র এই বৃত্তি পাবে। আর আপনার জন্মদিনে ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা’ এই স্কুল থেকে দেওয়া হবে।”
কাঞ্চন স্যার হঠাৎ চোখ মুছলেন। মঞ্চে উঠে আতিককে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “তোকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম ভেবেছিলাম। তুই ফিরে এসে আজ আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার দিলি।”
অনুষ্ঠান শেষে স্যার ব্যাগ গোছাচ্ছেন। উপহারের খামে ভরা ব্যাগটা একপাশে রেখেছেন। আরেক পাশে আলাদা করে রেখেছেন একটি সাদা খাম। তার ওপরে লেখা:
“আতিক আহমেদের জন্য”
চিঠির ভেতরে লেখা:
“আজ তুই আমাকে যা দিলি, আমি সারা জীবনেও তা পাইনি। একজন শিক্ষক তখনই সফল হন, যখন ছাত্র তাঁকে ‘স্যার’ বলে গর্ব করে। তুই আমার সেই গর্ব।
– কাঞ্চন স্যার”
পঞ্চগড়ের হিমেল বাতাসে সেদিন যেন একটানা শব্দ হচ্ছিল—
“স্যার, আপনি আমাদের কাছে সব সময় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, আছেন, থাকবেন…”
শেষের চিঠি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
51
Views
6
Likes
0
Comments
0.0
Rating