পঞ্চগড় জেলার এক ধুলোবালি ছোট গ্রামে, যেখানে গাছপালা মুড়ে রাখে গ্রামের ক্ষীণ কষ্টগুলো, সেখানে জন্ম নেয় অদিতি। বাবা-মা নেই তার, জন্মের পর থেকেই মামার বাড়িতে বড় হয়েছে সে — যেখানে ভালোবাসার কমতি আর অবহেলার ছায়া ছিল ঘনঘটা।
মামার বাড়িতে অদিতি ছিল অচেনা এক অতিথি। মামা নিজেও কঠোর মেজাজের মানুষ, তার জীবনে যতোটা ক্লেশ, তা নিজের গর্ভেই ঢেকে রেখেছে। তাই অদিতির প্রতি তার ভালোবাসা কখনো প্রকাশ পায়নি, বরং অবজ্ঞা আর কঠোর শাসনই ছিল তার কাছে।
অদিতি ছোট বেলা থেকেই শিখেছে কঠিন পরিশ্রমের মূল্য। স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি হাঁস-মুরগির খোঁজখবর, রান্নাবান্না, সব কাজ সামলাতো সে। তার ছোট্ট কাঁধে বাড়ির যত দায়িত্ব, মনটা ছিল ভীষণ কাবু। কিন্তু সে কখনো মাথা নোয়ায়নি।
গ্রামের ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি করে খেলে যখন, অদিতি তখন মাঠে কাজ, নিজের বয়সের চেয়ে অনেক বড়বাচ্চার মতো কষ্ট পায়। কিন্তু তার চোখে ছিল এক অদম্য চাওয়া—নিজেকে বদলে ফেলার, তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার।
একদিন স্কুলে এক শিক্ষক তাকে লক্ষ্য করলো। তার চোখে দেখলো শুধু এক দরিদ্র মেয়ের চেয়েও অনেক বেশি কিছু—একটা শক্তিশালী আত্মা, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অগাধ সম্ভাবনা। শিক্ষক তাকে উৎসাহ দিলো, “অদিতি, পড়াশোনা করো। তোমার ভাগ্য তোমার হাতেই।”
অদিতি নিজেও জানতো, তার কষ্টের পথে একমাত্র আলো পড়াশোনা। সে রাতের অন্ধকারে দীপের আলোয় বই পড়ত, কখনো ঘুমিয়ে পড়তো না।
দিন গড়িয়ে বছর গেল। অদিতির মাথায় সেই স্কুলের সাদা টুপি, হাতে ছিল একটি ছোট্ট ব্যাগ, আর তার চোখে নতুন স্বপ্নের আলোকচ্ছটা।
কিন্তু দুঃখ এখনও থেমে ছিল না। মামার গোপৌর্ব, প্রতিবেশীদের চোখ কাটা, সমাজের রূঢ় দৃষ্টিভঙ্গি—সবই তার জীবনকে চাপে রেখেছিল। একবার তো গ্রামের এক লোক তাকে অপমান করল, তার স্বপ্ন গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
তবু অদিতি হার মানেনি। সে জানত, এ পৃথিবী বদলানো যাবে শুধু নিজের হাতেই।
একদিন, শহরে এক এনজিও’র কর্মী তাকে দেখতে পেলো, তার গল্প শুনলো। সেখানে অদিতি পেলো টিউশন, সাহায্য, আর এক আশার জোয়ার। ধীরে ধীরে সে শহরের কলেজে ভর্তি হলো।
কলেজে সে নতুন জীবন পেলো। নতুন বন্ধু, নতুন আশ্বাস। সেখানে তার মতো অনেকেই ছিল, যাদের জীবনে ছিল কষ্ট আর স্বপ্নের সংঘাত। একসাথে তারা স্বপ্ন দেখলো, একসাথে তারা লড়াই করলো।
অদিতি বুঝতে পারল, কষ্ট যতই হোক, যদি মন জোরালো থাকে, কেউ তোমাকে নিচে নামাতে পারে না।
তার কলেজ জীবনের একদিন, সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল—
“আমার নাম অদিতি। আমি এক সময় একাকী, নিভৃত, অবহেলিত ছিলাম। কিন্তু আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে বলছি, আমাদের জীবনের কষ্টই আমাদের শক্তি। আমাদের স্বপ্নই আমাদের অস্ত্র।”
তার কথায় উপস্থিত সকলের চোখে জল এসে গেলো। সে হয়ে উঠল এক প্রেরণার নাম।
বছর কেটে গেল। অদিতি হয়ে উঠল সমাজের জন্য কাজ করা এক জ্বলন্ত মশাল। তার জীবনের গল্প শুনে বহু মেয়ের চোখে নতুন আশা জ্বলে উঠল।
মামার বাড়ির সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে একসময় কষ্টের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল, আজ নিজেই আলো হয়ে উঠেছে—অনেকের জীবনের পথ দেখিয়ে।
অদিতি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
53
Views
11
Likes
0
Comments
5.0
Rating