সময়টা ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস। আমি তখন একটা বেসরকারি ব্যাংকের খুলনা ও ফরিদপুরের আঞ্চলিক প্রধান। আমাদের কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা শাখা সুন্দরবন ভ্রমণের কর্মসূচি ঠিক করে রেখেছিল।
আমাদের ব্যাংকের কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা শাখার সব কর্মীর পরিবারসহ তিন দিনের কর্মসূচি। ভ্রমণের বাহন সদ্য নির্মিত নৌযান এমভি উৎসব। এটাই ওর প্রথম জলযাত্রা।
আমি রাত সাড়ে তিনটায় সপরিবার ফিরেছি ভুটান থেকে। সেই রাতেই (৮ নভেম্বর) আবার সুন্দরবন ভ্রমণ শুরু করতে হবে ।
আগের দিন সন্ধ্যায় ভুটানের ফুটসিলিং সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের জয়গাঁওয়ে রাত্রিযাপন করে সকালে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করি। বিকেলে বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে রাতের ট্রেন সীমান্তে চড়ে যশোরে পৌঁছাই রাত সাড়ে তিনটায়। বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে কিছু ব্যবহৃত জামাকাপড় বাদ দিয়ে নতুন কিছু ব্যাগে ভরে বাড়ির সামনে দাঁড়ানো বাসে উঠে পড়ি।
সপ্তাহখানেক দেশের বাইরে থাকায় দেশের আবহাওয়ার কোনো খোঁজখবর আমাদের জানা ছিল না।
বাস যথারীতি সকালে খুলনা লঞ্চঘাটে পৌঁছালে আমাদের নির্ধারিত নৌযান এমভি উৎসবকে দেখতে পেলাম। নতুন ঝকঝকে নৌযানটি দেখে দলের সবাই খুব খুশি। সবাই যার যার নির্ধারিত কেবিন দখলে নিল। কিছু সময় পর সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু করল। ইতিমধ্যে নাশতার সময় হলো। সবাই যার যার মতো নাশতা সেরে নিল। এরপর সকাল ১০টার দিকে সুন্দরবনের উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে দিল। পরে জেনেছি, আমাদের যাত্রার আধা ঘণ্টা পরে আর কোনো নো নৌযানকে ঘাট ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে আমরা সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম খুব খুশিমনে। দুপুর ১২টার পর থেকে আকাশ একটু একটু করে কালো হতে দেখলাম। তাতেও আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। মধ্যাহ্নভোজও হয়ে গেল মহাসমারোহে। এরপর আকাশ একদম কালো হয়ে গেল। শুরু হলো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, সঙ্গে দমকা হাওয়া। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। লঞ্চ চলতেই থাকল। দিন শেষ হয়ে গেল, একসময় লঞ্চ প্রবেশ করল সুন্দরবনের ভেতর, তখন ভরসন্ধ্যা।
এ সময় আমরা মুঠোফোনের নেটওয়ার্কের মধ্যে ছিলাম। স্থল থেকে বারবার ফোন আসছিল আমাদের ফিরে যাওয়ার জন্য। ইতিমধ্যে দেশের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যে বিপত্তির খবর দেওয়া হয়েছে, তার কিছুই আমাদের কাছে ছিল না। আমরা জানতাম না যে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলে আঘাত হানতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে ১০ নম্বর সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছে। আমরা এমন একটা জায়গায় ছিলাম, যার প্রায় তিন দিকেই স্থল। ফলে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার অস্বস্তি বুঝতে পারলেও ঝড়ের
প্রকৃত তাণ্ডব বুঝতে পারছিলাম না। লঞ্চের লোকেদের ফেরার কথা বললে তাঁরা
আমাদের বিভিন্নভাবে বোঝালেন যে ভয়ের কোনো কারণ নেই। লঞ্চের ছিল এটা একদম প্রথম যাত্রা, তাই তাঁরা কোনোভাবেই যাত্রাটা বাতিল করতে চাইছিলেন না। এরই মধ্যে রাত ৯টা বেজে গেল, রাতের খাবারও শেষ হলো। কী কারণে জানি না, পানির ওপরে রান্না করা খাবার সব সময় অপূর্ব স্বাদের হয়। লঞ্চে বিভিন্ন ধরনের খাবার দেওয়া হয় এবং সেগুলো সবই সুস্বাদু। এদিকে ডাঙা থেকে আমাদের ফেরার জন্য ফোনে তাগাদা চলতেই থাকল। বড়, ছোট, নারী, শিশু লঞ্চের লোক জনা বিশেকসহ আমরা মোট ৫২ জন।
পুরো দলের মধ্যে পদমর্যাদায় আমি সবার ওপরে। এবার সবাই আমার কাছে সিদ্ধান্ত চাইল। আমি বুঝলাম, এখন আর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। রাত ১১টার সময় লঞ্চের লোকেদের ডেকে বলে দিলাম, কোনো কথা শুনতে চাই না, লঞ্চ ফেরানোর ব্যবস্থা করুন। তাঁরা কিছুটা গাইগুই করেঅবশেষে সুন্দরবন থেকে খুলনায় ফেরার জন্য লঞ্চ ঘোরালেন। শুরু হলো ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। লঞ্চে দুই ধরনের লোক ছিলেন। একধরনের
এক দল লোক জানতেন না বিপদের মাত্রা, তাঁরা নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে রাত পার করে দিলেন। আরেক দল যাঁরা বিপদ সম্পর্কে জানতেন, তাঁরা ভয়ে একদম বোবা হয়ে গেলেন। আমার পরিবারের সদস্যদের বিপদ সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায়, তারা দিব্যি ঘুমিয়ে রাত পার করে দিল। আমি নিজেও এই দলেই ছিলাম। সারা রাত যা ঘটেছে, তার বিন্দুবিসর্গও আমরা জানি না। অন্যরা তো ভয়ে একদম চুপ। সকালে যখন ফজরের নামাজের জন্য উঠেছি, তখন দেখলাম লঞ্চ খুলনার কাছাকাছি, পশুর নদের শেষ ভাগে।
ইতিমধ্যে ঝড়ের তাণ্ডব কিছুটা কমলেও অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। অবশেষে সকাল সাতটায় খুলনার জেলখানা ঘাটে পৌঁছে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। রীতি অনুযায়ী লঞ্চ কর্তৃপক্ষ সকালে ভুনা খিচুড়ি, হাঁসের মাংস, বেগুনভাজা, ডিমভাজা দিয়ে নাশতার পর লঞ্চ থেকে নামতে দিল। অবশেষে শেষ হলো আমাদের ২৪ ঘণ্টার অসমাপ্ত সুন্দরবন ভ্রমণ। এটা সবার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে সারা জীবন।
অসমাপ্ত ভ্রমণ!
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
38
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating