না করে দিলাম

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
নিজের বিয়ের জন্য পাত্র দেখতে গিয়েছিলাম একটা রেস্টুরেন্টে। বুক দুরু দুরু করছে, ওটাই প্রথম একাকী কোন ছেলের সাথে নিজের বিয়ের জন্য আলাপচারিতা করা। আমার নিজস্ব কনফিডেন্স এর কোন অভাব নেই কিন্তু তবুও বাসায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার প্র্যাকটিস করেছিলাম। কিভাবে কথা শুরু করব, কি বলবো তা নিয়ে একটু নার্ভাস ছিলাম।
আমার পরিবার ছেলে আর ছেলের পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে এসেছে তাদের ভালো লেগেছে। অবশ্য ভালো না লাগার কোন কারণ নেই। ছেলে পেশায় একজন চিকিৎসক, পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছিল, ছোট শিক্ষিত পরিবার , বড় বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই উনি কানাডায় হাজবেন্ডের সঙ্গে থাকেন। ছেলে উচ্চতায় একটু খাটো অবশ্য এসব ব্যাপার নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না, বাহ্যিক রূপ দেখে আমি কখনোই মানুষ বিচার করি না । ছেলের পরিবার আমার অজান্তেই চুপিসারে আমাকে আমার কর্মস্থলে দেখে গেছে এবং শুনেছি আমাকে তাদের পছন্দও হয়েছে । তাই দুই পরিবারের সম্মতিতেই সেদিন আমরা নিজেরা কথা বলতে গিয়েছিলাম।

দুবার অবশ্যই উনার সাথে ফোনে কথা হয়েছে আমার তবে সেটা স্বল্প সময়ের জন্য। সেদিন প্রথম দেখা, রেস্টুরেন্টে ঢুকে চিনতে ভুল হলো না। উনিও সহাস্যে উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ হাই হ্যালো এই ধরনের কথাবার্তা চললো। তারপর কথা চলে গেল একটু ভিন্ন দিকে যেমন আমি রান্না করতে পছন্দ করি কিনা কোন কোন রান্না ভালো জানি ঘর গোছাতে আমার কেমন লাগে এসব কথাবার্তা। যদিও আমার কাছে একটু হাস্যকর লাগছিল মান্ধাতার আমলের প্রশ্নগুলো শুনে কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই এখানে উনি ডাক্তার হিসেবে আসেননি ভদ্রলোক এসেছেন উনার জন্য একজন ভালো সহধর্মিনী পেতে, যে আগামী পুরোটা জীবন তার পথ চলার সঙ্গী হবে। তাই আমি হাসিখুশি ভাবেই তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবার চেষ্টা করছিলাম। তবে একটা বিষয় অবশ্য অবাক লেগেছিল উনি পেশায় একজন ডাক্তার আর আমিও তাই , কাজেই আমাকে অন্তত তার এই প্রশ্ন করা উচিত ছিল আমি ভবিষ্যতে কি করতে চাই আমি কোন বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে চাই, আমি আদৌ সরকারী চাকরির জন্য বিসিএস এর প্রস্তুতি নিচ্ছি কিনা, উনি অবশ্য এসব জানতে চাননি। তবে সেসব নিয়ে তখন খুব একটা মাথা ঘামালাম না। উনার কাছে যে প্রশ্নগুলা গুরুত্বপূর্ণ হয়তো উনি তখনকার মতো সেই প্রশ্নগুলোই আগে করছেন পরে অবশ্যই জানতে চাইবেন এইসব ব্যাপারে। তখনকার মতো ছেলেটাকে ভালোই লাগলো আমার, তার চমৎকার বাচনভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আকারে ইঙ্গিতে বুঝতে পেরেছিলাম উনিও হয়তো আমাকে পছন্দ করেছেন। হালকা কিছু খাবার খেয়ে মোটামুটি পৌনে এক ঘন্টা সময় আমরা রেস্টুরেন্টে কাটিয়ে যার যার বাড়ি ফিরে এলাম।

বাড়ি ফিরলাম এবং আমি "না" করে দিলাম একদম ঠিক বলেছি আমি "না" করে দিয়েছিলাম সেদিন।

পাত্র হিসেবে ছেলে আমার পছন্দ হয়েছিল। না করার কোন কারণ নেই, আমি কোন রাজকন্যা কিংবা পরী নই তবুও এত ভালো ছেলে কে আমি "না" করে দিয়েছিলাম। কারণটা অনেকের চোখে অত্যন্ত সামান্য। ওয়েটার যখন খাবারের অর্ডার নিতে এসেছিল উনি একবারও আমার কাছে জানতে চাননি আমি কি খেতে চাই, উনি উনার পছন্দমত খাবার সার্ভ করতে বলেছিলেন। আদৌ জানতে চাননি আমি ওই খাবার পছন্দ করি কিনা কিংবা খাই কিনা। এটা আমাদের খুব স্বাভাবিক ভদ্রতার মধ্যে পড়ে, রেস্টুরেন্টে একজন আরেকজন কে ইনভাইট করলে কিংবা দেখা করতে গেলে "আপনি কি নেবেন"এই প্রশ্নটা করা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু উনি সেই প্রশ্নের ধারেকাছে যান নি উল্টো এমন একটা খাবার অর্ডার করেছেন যেটা আমি কখনোই খাই না। সব মানুষ সব জিনিস খাবে এরকম কোন নিয়ম নেই কিন্তু আমি ভদ্রতার খাতিরে সেদিন হাসিমুখেই চামচ নাড়াচাড়া করেছিলাম।

ভীষণ ছোট্ট একটা ব্যাপার তাই না? অনেকেই বলবে এতোটুকু কম্প্রোমাইজ করাই যায় কিন্তু সত্যি বলতে কি প্রথম দেখাতেই যে ছেলে আমার পছন্দের কোন মূল্যায়ন করলো না, সম্মতি নেবার প্রয়োজন বোধ করলো না, সে বিয়ের পরে আমাকে কতটুকু মূল্য দেবে কিংবা আমার পছন্দ অপছন্দের মূল্যায়ন টা ঠিক কিভাবে করবে সেটা আমি তৎক্ষণাৎ চোখের সামনে দেখতে পেয়েছিলাম।
যখন তার সাথে আমি জীবন কাটাবো তখন এই ছোট্ট ছোট্ট "না" করতে না পারার অনুভূতিটা এক সময় হাহাকারের রূপ নিবে। দিনশেষে হয়তো সেটা কিছুই না কিন্তু মাস শেষে বছর শেষে আর জীবন শেষে সেটা এক সমুদ্র অতৃপ্তির জন্ম দিয়ে স্রষ্টা প্রদত্ত আমার এই একটি মাত্র জীবনকে বিষাক্ত করে তুলবে।

266 Views
8 Likes
1 Comments
4.6 Rating
Rate this: