সেই শীতের রাতটা আজও ভুলতে পারে না কেউ — গ্রামের নাম কাশিপুর। চাঁদের আলো আর কুয়াশা মিলে পুরো গ্রাম যেন ঝাপসা এক ছবি। গ্রামের একদম প্রান্তে বুড়ো বটগাছ, আর বটগাছের নিচে ছোট্ট মন্দির। বহু বছর আগে কেউ আর ওখানে যায় না।
সবচেয়ে ভয় পাওয়া যায় যখন নিশির ডাক পড়ে — অন্তত তাই বলে গ্রামের বয়স্করা।
কারণ রাত বারোটার পরে, ওই বটগাছের দিক থেকে যদি কারও নামে তিনবার ডাক আসে — তার আর ফেরত আসা হয় না।
কিন্তু মানুষ তো মানুষই — সব কিছুরই যুক্তি খোঁজে। শ্যামলও তেমনই এক জেদি ছেলে। সদ্য কলেজ শেষ করে শহর থেকে ফিরেছে। ভয়-টয় কিছুই মানে না। বুড়ো ঠাকুমা কতবার বলেছে, “ও দিকটায় রাতে যাস না শ্যামল, নিশি নাম ধরে ডাক দেবে!”
শ্যামল হেসে উড়িয়ে দেয় — “ভূত, নিশি এসব বাজে কথা! সবই গল্প!”
২.
এবার গ্রামের মেলা হবে, বছর শেষের মেলা। গ্রামের ছোট্ট স্কুলের মাঠে লোকজন গাছের ডাল থেকে লণ্ঠন ঝুলাচ্ছে, পিঠাপুলি, নাগরদোলা — সব চলছে জোরে।
মেলার আগের রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে শ্যামলের মাথায় চাপল ‘চ্যালেঞ্জ’।
বন্ধু মজনু বলল,
— “যা রে, শ্যামল! তোর এত সাহস, রাত বারোটায় বটতলায় গিয়ে দেখিয়ে আয়!”
— শ্যামল হেসে বলল, “দেখিস, আজই যাচ্ছি! নিশি-ফিশি বলে কিছু নাই!”
কেউ ঠিক বিশ্বাস করল না, কেউ আবার ভয়েও চুপ।
কিন্তু শ্যামল ঠিক করেই নিল, বন্ধুদের সামনে সাহস প্রমাণ করতেই হবে।
৩.
রাত প্রায় সাড়ে এগারো।
শ্যামল চুপিচুপি মায়ের রান্নাঘর থেকে মাটির বাতি আর দেশলাই নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পায়ের নিচে মরা পাতা কড়কড় করে উঠছে। দূরে শেয়ালের ডাক। মাঝে মাঝে পুকুর পাড়ের কুয়াশা সরিয়ে জোনাকির আলো।
বটতলার দিকে এগোতেই হাওয়া যেন একটু ঠান্ডা হয়ে গেল। বটগাছের ছায়া মাটিতে এমন ভাবে পড়েছে যেন কেউ বসে আছে। শ্যামল চোখ কচলাল — কিছু না! সব কুসংস্কার। সে গিয়ে গাছের গোড়ায় রাখা পুরনো পাথরের বেদিতে মাটির বাতি জ্বালাল। বাতির কমল আলোয় ছায়াগুলো নড়ছে।
ঠিক সেই সময় —
পেছন থেকে ভেসে এল খুব মিহি এক নারীকণ্ঠ।
— “শ্যা-মল…”
একবারেই ঠাণ্ডা লাগল শিরদাঁড়া বেয়ে। সে পেছন ফিরে দেখল — কেউ নেই!
— আবার — “শ্যা-মল…”
এবার আরও কাছে মনে হলো।
৪.
শ্যামল হেসে গলা ঝাড়ল — “কে? মজনু তুই? আর তোর নাটক?”
কোনো উত্তর নেই। বাতি হাওয়ায় দুলছে। চারপাশে শুধু বটপাতার খসখস। আর একবার কণ্ঠস্বর — এবার একটু খেয়াল করেই শুনতে পেল — গলার আওয়াজ যেন তার মায়ের!
— “শ্যামল… বাড়ি যা বাবা… বাড়ি যা…”
শ্যামলের গলা শুকিয়ে এলো। মা তো ঘরে ঘুমাচ্ছে!
হঠাৎ বাতি নিভে গেল — নিভে গেল কেমন করে! বাতাসই ছিল না! শ্যামল থম মেরে দাঁড়িয়ে। হাওয়া থেমে গেছে, শিয়ালও চুপ, চারপাশের শব্দ অদৃশ্য।
শুধু… পেছনে পাতার খসখস। যেন কেউ হাঁটছে… খুব ধীরে… বটগাছের গায়ে লেপ্টে থাকা অন্ধকারের ভেতর থেকে।
শ্যামল দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু পা যেন পাথর হয়ে গেল। শীতল একটা হাত তার কাঁধে পড়তেই হাওয়া ভারি হয়ে এলো।
৫.
সে যা দেখল, কেউ বিশ্বাস করবে না — অন্ধকারে এক শীর্ণ, সাদা শাড়ি পরা মেয়ের অবয়ব। চুল ঝুলে আছে, চোখ নেই — শুধু ফাঁকা। ঠোঁট নেই, মুখ হা করে খোলা। মুখ থেকে শুধু ফিসফিস আওয়াজ —
— “আমার… নাম… নে… না…”
শ্যামল বুজতে পারছে না দৌড়াবে না কাঁদবে। সে প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে শোঁ শোঁ আওয়াজ — যেন ছায়াটাও উড়ে আসছে! বুকের ভেতর ধুকপুক, গলার ভেতর কথা আটকে যাচ্ছে।
৬.
সকালে গ্রামের মানুষরা বটতলার কাছে শ্যামলকে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পেল। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, মুখে শুধু একটুকরো কথা — “নিশি…”
যে ছেলে কখনও ভূত মানত না, সে এবার কথা বলা বন্ধ করে দিল। কে যেন বলাবলি করে — নিশির ডাক পেয়েও ফিরে এসেছিল — কিন্তু তার আত্মা না কি পুরোপুরি ফেরেনি।
শ্যামল আজও বটতলার পাশে চুপচাপ বসে থাকে — নিশির ডাক শুনতে পায়।
মা ছেলেকে আর স্বাভাবিক করতে পারেনি। গ্রামের লোক মন্দিরে আবার তালা মেরে দিয়েছে। আর কেউ নিশির নাম মুখে আনে না।
---
শেষ
নিশির ডাক
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
66
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating