আলো ছড়ানো এক মানুষ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
অন্যান্য দিনে, অন্য কোনো সময়, আমি যখন হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কথা ভাবি, তখন মনে হয় তিনি শুধু একজন লেখক নন; তিনি যেন আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার প্রতিটি শব্দে এমন এক উষ্ণতা লুকিয়ে থাকে, যা আমার অস্থির মনকে স্বস্তি দেয়, জীবনের কঠিন পথে পথপ্রদর্শক হয়। আমি জানি, স্যার শুধু গল্প বলেননি—তিনি বেঁচে থাকার গল্প বলেছেন, মানুষকে বোঝার গল্প বলেছেন, ভালোবাসার গল্প বলেছেন।

আমি ভাবি, কখনো যদি সে দিন ফিরে আসে যখন আমি প্রথম ‘অপেক্ষা’ পড়ছিলাম। কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি ছিল। সেই অপেক্ষার ছায়ায় ঢাকা ভোর, নিঃশব্দ রাতে মনে হত—অপেক্ষা শুধু কাহিনী নয়, যেন আমার নিজের জীবন, আমার নিজের ভাবনা। নবনী নামের মেয়েটির ব্যথা, তার সাহস, তার ভালোবাসা—সবই আমার হৃদয়ের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। সে এক অদ্ভুত রহস্য, এক শান্ত বিরহের গল্প, যা আমি যতবার পড়ি, ততবার নিজেকে খুঁজে পাই।

আর হিমু! ওর কথা যখন মনে পড়ে, হাসি ধরে রাখতে পারি না। অসাধারণ চরিত্র, যিনি সবসময় অন্যরকম ভাবেন, অন্যরকম চলে, আর তার দৃষ্টিকোণ দিয়ে আমি দেখেছি জীবনকে এক নতুন আলোয়। হিমুর সরলতা, তার বিশ্বাস, আর সেই অদ্ভুত জীবনদর্শন আমাকে শেখায়—কিভাবে মুক্ত হতে হয়, কিভাবে অজানার মাঝে আনন্দ খুঁজতে হয়। যখন আমি হিমুর মতো একজনকে সামনে পাই, তখন বুঝি, জীবনে বাধা আসবে—তবুও হাসতে হবে, ভালোবাসতে হবে। হিমুর গল্পগুলো শুধু বিনোদন নয়, জীবনযাপনের দর্শন।

মিসির আলী—হুমায়ূন স্যারের অপর একটি প্রতিভাবান সৃষ্টি। বিজ্ঞান ও রহস্যের সংমিশ্রণে ভরা সেই চরিত্রের মধ্য দিয়ে আমি শিখেছি কিভাবে যুক্তি ও অনুভূতির সমন্বয়ে সত্যের সন্ধান করতে হয়। মিসির আলীর তদন্তের পেছনে থাকে মানুষের দুর্বলতা, ভালোবাসা, ভুল-ত্রুটি—সবকিছুই বুনে যায় এমন এক জটিল কাহিনিতে যা আমাকে অবাক করে দেয় বারবার। তাঁর গল্পগুলো আমার মনে প্রশ্ন তোলে, মানুষের মন কেমন এক রহস্যময় জায়গা, যেখানে সবকিছু ঘটতে পারে।

স্যারের উপন্যাসগুলো শুধু গল্প নয়, তারা আমার জীবনের আয়না। প্রত্যেকটি চরিত্র যেন আমার জীবনেরই অংশ, আমার নিজেরই ছায়া। আমি মনে করি, তিনি যেমন বলতেন—‘মানুষ তো গল্প বলতেই ভালোবাসে, আর সেই গল্পই আমাদের জীবনের বৃত্তান্ত।’ স্যার আমাকে শিখিয়েছেন, মানুষের ভালোবাসা, ভুল, সংগ্রাম, আশা সবকিছু একসাথে মিশে একটি সম্পূর্ণ জীবন রচনা করে।

অনেক সময় ভাবি, কতোটা সৌভাগ্য যে আমার মতো একজন সাধারণ পাঠক তাঁর গল্পের সাথেই নিজেকে এক করেছে, তার ভেতরের দুঃখ, তার একাকীত্ব, তার আনন্দ আমার নিজের মনে ফিরে এসেছে। সেই গল্পগুলো আমার জীবনের অন্ধকারে আলোর দীপ, যখন হারিয়ে যাই তখন সেগুলোই আমাকে পথ দেখায়।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে আমি পেয়েছি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—যেন জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বড় সত্যকে ঘিরে থাকে। আমি বুঝেছি, প্রত্যেক মানুষের জীবনের গল্পই গভীর, যেখানে ভালোবাসার ছোঁয়া, বিরহের টান, মায়ার বন্ধন মিলেমিশে এক অপূর্ব সুর সৃষ্টি করে।

তার গল্পগুলো আমাকে শিখিয়েছে—যতই কঠিন হোক জীবন, মানুষের মন অটুট থাকে, ভালোবাসা থেকে যায়, আর অপেক্ষা করতে হয় সত্যের জন্য। তিনি যেমন বলে গেছেন, ‘একটি গল্পের শেষ নেই, যতক্ষণ না পাঠক শেষ কথা বলে।’ আর আমি সেই পাঠক, যিনি বারবার তাঁর গল্পে ফিরে আসি, নতুন করে শিখি বাঁচতে।

অন্যান্য দিনে, অন্য কোনো সময়, আমি আবার সেই বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি, অপেক্ষা, নবনী, হিমু, মিসির আলীর সঙ্গেই। তারা যেন আমার জীবনের সঙ্গী, আর হুমায়ূন আহমেদ স্যার, আমার জীবনের এক অদৃশ্য শিক্ষক।
77 Views
10 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: