সাইলেন্স হাউজ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
স্থান: সেন্ট এন্ড্রুজ, স্কটল্যান্ডের এক পাহাড়ঘেরা নিঃসঙ্গ উপত্যকা।
সময়: জানুয়ারির শেষ রাত, বরফ ঢাকা পাহাড় আর নিঃশব্দ পৃথিবী।

অ্যালেন গ্যারি, ৩১ বছর বয়সী ব্রিটিশ লেখক, বেশ কয়েক বছর যাবৎ মানসিক সংকটে ভুগছিল। শহরের কোলাহল থেকে পালিয়ে সে চলে এসেছিল স্কটল্যান্ডের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে — উদ্দেশ্য ছিল একা থেকে নিজের ভেতরের দানবদের মুখোমুখি হওয়া, নিজের নতুন বইয়ের খসড়া লেখা।

স্থানীয়রা সেই পাহাড়ি বাড়িটাকে বলত “Silence House” — নীরবতার বাড়ি।
কেউ থাকতো না, কেউ বিক্রি করতে চায় না, এমনকি কোনো গল্পও বলেনা কেউ।
তবুও সস্তা ভাড়ায় একমাসের জন্য অ্যালেন তা নিয়ে নিলো।

প্রথম সপ্তাহ কেটেছিল বেশ শান্তভাবে। সাদা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সকালে কফি খাওয়া, কাঠ জ্বালিয়ে রাত্রে আগুনের পাশে বসে গল্প লেখা — যেন গল্প নয়, শান্তির উপন্যাস।

কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে কিছু বদলাতে লাগল। রাত বারোটা নাগাদ তার ঘরে দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে যেত, অথচ ব্যাটারি নতুন ছিল। সকালে আবার চলত।

তৃতীয় রাতে, বারান্দায় বসে থাকার সময় সে স্পষ্ট দেখতে পেল—হিমশীতল কুয়াশার ভিতর দিয়ে একটা ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট, মুখ ঢাকা কালো ঘোমটা দিয়ে।

"হ্যালো?" — অ্যালেন ডাক দিল। কিন্তু উত্তর এল না।

পরদিন সকালে মেঝেতে দেখতে পেল পানির ভেজা পায়ের ছাপ, ঘরের ভেতর থেকে দরজার বাইরে গেছে। অথচ ঘর ভেতর থেকে লক করা ছিল।

এক রাতে ঘুমানোর আগে জানালায় হাত রাখতেই সে অনুভব করল কারো নিঃশ্বাস—গরম, ভারী আর পশুর মতো।

“এটা মানসিক বিভ্রম,” সে নিজেকে বোঝাতে চাইল।
তবু ভয়ের গন্ধ যেন তার মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল।

পঞ্চম রাতে, বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সে দেখতে পেল—তার পেছনে দাঁড়িয়ে এক সাদা পোশাক পরা নারী, যার মুখ নেই, শুধু কাঁদা আর আঁকাবাঁকা নখ।

সে ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। আয়নায়ও আর কিছু নেই।

অ্যালেন তৎক্ষণাৎ তার ফোন হাতে নিয়ে ছবি তুলল, কিন্তু ছবিতে এসেছে শুধু অন্ধকার, আর ডানপাশে ঝাপসা একটা ছায়া।

ছায়াটির চোখ ছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল সে তাকিয়ে আছে।
একদৃষ্টিতে, নীরবে।

সেদিন রাত ৩টা ১২ মিনিটে সে শুনল, তার ঘরের দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, বারবার।
“খুলো... আমি ফিরে এসেছি...” — কণ্ঠটা শোনাল খুব গলা চেপে ধরা, জলভরা গলার মতো।

অ্যালেন হঠাৎ মনে করতে পারল, বাড়ি নেয়ার সময় একজন বৃদ্ধা বলেছিলেন,
“এই বাড়িটা একসময় কেটি নামে এক নার্সের ছিল। মানসিক রোগীদের যত্ন নিত। একদিন তার পোষা মেয়ে রোগী তাকে ছুরি দিয়ে খুন করে। তারপর বাড়ির চারপাশে শুধু কান্নার শব্দ পাওয়া যেত... আর তারপর সবাই একে বলত ‘সাইলেন্স হাউজ’।”

সেই মুহূর্তে সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল—এক জোড়া রক্তমাখা পা, হাঁটুর নিচ থেকে নেই কিছু, অথচ দাঁড়িয়ে আছে।

সে দরজা আটকাল, জানালা বন্ধ করল, কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় লুকাল।
তখনি পেছনে ফিসফিস করে একটা কণ্ঠস্বর বলল—
“তোমার গল্পগুলো পড়ি আমি... খুব ভালো... এবার আমি তোমাকে আমার গল্পটা বলব...”

সেই রাতে অ্যালেন আর লেখেনি।

পরদিন লোকজন এসে দেখতে পেল, বিছানার উপর তার খোলা ডায়েরির একমাত্র লাইন ছিল:
“সে এসেছে, এবং এবার চুপ থাকবে না।”

সেই বাড়ি এখনো আছে।
আর প্রতি জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে, যখন রাত গভীর হয়,
কেউ না কেউ বলে—
"সাইলেন্স হাউজ থেকে একটা আলো দেখা যায়... আর একটা ফিসফাস শোনা যায়..."
81 Views
9 Likes
1 Comments
0.0 Rating
Rate this: